প্রীতিলতা

আমার নাম নারী!

আমার নাম নারী!
-সুখী ইসলাম

খয়েরী ত্বকের কন্যা হয়ে জন্মানোর পর হাতের রেখায় বা কপালের ভাজে সিঁথিনে রাখা সাদা খাতায় লাল কলমে ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখে গেছে ভাগ্য দেবতা। জন্মের পর খালা তার জংলী ছাপা শাড়ী উচিয়ে ছুটে গেছিল কপাটের বাইরে অপেক্ষারত থাকা বাপ দাদাদের কাছে। কন্যার জন্মের কথা বলার সময় পান চিবানো দাঁত বের করে খুব কষ্টে মলিন হাসি হেসেছিল মায়ের আপন বোন।কপাটের বাইরে অধির আগ্রহে থাকা পুরুষ নামক দাদা চাচা কিংবা বাবা কষ্টের হাসি হেসেছিল।কোথা থেকে কোন মগ ডালের পর থাকা মৌমাছিকে ভয় দেখিয়ে কেটে আনা হয়েছিল বেশ একদলা কুসুম।কুসুমের ভিতর যারা বাসা বেঁধেছিল,বৈশাখে মাত্র তারা বিছানা পেতেছিল।তারা আর ঘুমোতে পারেনি ইনসেমিনিয়ায়।পাগল হয়ে কাঁচের বোয়ামের গা ঘেঁসে পিছলে পড়ে মারা গেছে।তাদের রস মুখে দিয়ে মুখ মিষ্টি করতে চেয়েছিল দাদী। যাতে করে মধু মাখা মিষ্টি মুখ দিয়ে কখনও অশ্রাব্য বুলি না বের হয়,টক শব্দচয়ন যেন না হয়।সারা বাড়ি ধুপের ধোয়া খাটের নিচে, তোষকের তলায় ধোয়া উঠিয়েযুবা বয়সীদের এ্যাজমা বাড়িয়ে শুদ্ধি করা হয়েছিল আতুড় ঘর।

তখন হয়তো ইনফ্যান্টাইল জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছিলাম কিনা জানিনা।মা যখন প্রক্ষালন থেকে ফিরে আতুড় ঘরে প্রবেশের পথে রাখা জলন্ত অংগারে হাত পা ঘষে ঘষে সেঁকে আসতো, তখন কী মা ভেবেছিল আমিও মায়ের মত শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া আর কাম ক্ষুধা মেটানোর জন্যই জন্ম নিয়েছি।হয়তো মা তার নিয়তি দেখে আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে বা ক্লান্ত চোখে তাকিয়েছিল।আমার জন্মের পর অতি আনন্দে মিষ্টি খেয়ে কোলেস্টরল ও ডাইবেটিস বাড়িয়ে হার্ট এ্যাটাকের সম্ভবনার শেষ প্রান্তে কেউ গিয়েছিল কিনা জানিনা।তবে যেবার কাঠের টুকরোর জলন্ত আগুনকে সাক্ষী রেখে সাঁতপাক ঘুরেছি,সেবার অনেকেই মরণ খাওয়া খেয়ে কোলেস্টেরল বাড়িয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করেছে অনেকেই। আমার উত্তরঙ মাংসপিন্ডের উপর মুষ্ঠির আয়েশের উল্লাসে হলুদ মাখিয়ে নৃত্য করেছে অনেকে।আমি কিন্তু নিখুঁতবাবে বিষন্নতার এক সমীকরণে ছিলাম।অনুকরন করে লালটিপ পরে নিজেকে লাল শাড়ীতে জড়িয়ে একটু হেসে হেসে বলি দিয়েছিলাম জলবিছানায়।উটের চামড়ার বুট পরা পায়ের নিচে ধংস এঁকে মাংসগুলোকে সপে দিয়েছিলাম পৈরষত্বের কাছে ।আবার আমি নিজেই দেহের খাচার খাঁজে খাঁজে ভরে নিয়েছি ভ্যক্সিন।নতুন জন্ম বিদায় নিয়েছে হাতের মাংসে গোজা এক,দুই,তিন করে পুতে রাখা জন্ম নিয়ন্ত্রণ কাঠি ফিমার।কত নতুন মুখ ধংস করেছি তার হদিস নেই।তবে আমি ক্ষণে ক্ষণে জন্ম নিয়েছি মুষ্টির ফাঁকে পূনরবার।ইচ্ছেই হোক আর অনিচ্ছায় হোক আমার নামের কখন যে আহুতি হয়েছে জানতেই পারিনি।যখন মায়ের কোলে চড়ে পা দুলিয়ে দুলিয়ে আঙ্গুল চুষেছি,সবাই বলেছে অমুকের বা মেয়ে বা কখনও আবার বলেছে অমুকের নাতী।

যখন কৈশরে কোমর দুলিয়ে চুল এলিয়ে হেটে গেছি তখনও চোখ বাঁকিয়ে সবাই বলেছে অমুকের মেয়ে যাচ্ছে। আবার যখন শাড়ী পরে মাথায় ঘোমটা টেনে গেছি তখনও বলেছে, অমুকের বউ।দশ মাস দশ দিন পেটে ধারণ করা সন্তান,যার শরীরের প্রতিটি রক্ত বিন্দু আমার শরীর থেকে নিংড়ে নেওয়া রক্ত থেকে গঠিত।যে কিনা আমার সন্তান,আমার পরিচয়ে পরিচিত হবে। তার সাথে হাটলেও বলেছে অমুকের মা।আজ আবার যখন কালো চুলে পাঁক ধরেছে। নাতীনাতকুরের সাথে হেটে যায়।তখনও সবাই বলে অমুকের দাদী যাচ্ছে। অমুক আর তমুকের মাঝে আমার নামের আত্মাহুতি হয়েছে বারংবার, জলান্জলি দিয়েছি নামের। একটাই নাম আমার নারী, নারী নারী।

Related Posts