প্রীতিলতা বিশেষ প্রতিবেদন

লাল-সবুজের পতাকা হাতে ১৩৫ দেশে!

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: লাল-সবুজের পতাকা হাতে ১৩৫ দেশে ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশের গর্ব সর্বাধিক রাষ্ট্র ভ্রমণকারী প্রথম বাংলাদেশি নাজমুন নাহার। রোববার কোস্টারিকার তামারিন্দ শহরে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে দেশ ভ্রমণের ইতিহাসের গড়েন তিনি। এবারের অভিযাত্রায় তিনি ম্যাপ করেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার মধ্যে ক্যারিবীয় ও প্যাসিফিকের সমুদ্রের কোস্ট লাইনের দেশ গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও কোস্টারিকা পর্যন্ত। ইতিহাসের সেরা সাহসী নারী নাজমুন নাহার। যিনি নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখেছেন ছোটবেলা থেকেই। যে পথ চলতে জানে, নিজে জাগ্রত হতে জানে, অন্যকে জাগ্রত করতে জানে, তার যাত্রা পথে যত বাধাই আসুক না কেন তিনি সবকিছুর অতিক্রম করে চলছেন পৃথিবীর পথে পথে।

শুক্রবার ফেসবুকে এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। যা আমাদের পাঠকদের জন্যে হুবহু তুলে ধরা হলো- ১৩৫ দেশ অভিযাত্রা শেষে এখন কানাডার টরন্টোর এসে পৌছালাম। যখন কোস্টারিকার শুভ্র মেঘের আকাশ ভেদ করে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্লেনটি ছুটে চললো টরন্টোর উদ্দেশ্যে। প্লেনটি ১৬০০ ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিল। পাহাড় আর সমুদ্র ভেদ করে আকাশ সীমানার কাছাকাছি প্লেনটি উড়ছিল। আমি প্লেনের ভেতর থেকে জানলার পাশ দিয়ে তাকাচ্ছিলাম সেন্ট্রাল আমেরিকার অপূর্ব দেশগুলোর গুলির দিকে। যদিও এই দেশগুলোকে আমি খুব কাছ থেকে দেখে এসেছি, কিন্তু আকাশ থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম তার ভিন্ন রকম রূপ!

কাছ থেকে দেখা এবং আকাশ থেকে দেখার মধ্যে কেমন যেন ভিন্নতা রয়েছে। মেঘের উপর থেকে প্লেনের জানালা দিয়ে আমার অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে আছি কোস্টারিকা দিকে। একটা দেশকে আকাশ থেকে দেখতেও যে কত অপূর্ব লাগে আমি দু’চোখ ভরে তা দেখে নিয়েছি। পৃথিবীর সৌন্দর্য্য দেখার জন্য আমার দু”চোখে যেন কোন ক্লান্তির অবকাশ নেই।

যখন আমি নিচের দিকে তাকাচ্ছিলাম সাদা- সাদা মেঘ ভেদ করে দেখা যাচ্ছে কোস্টারিকার ভলকানিক সামিট, ছোট-ছোট মায়াবী দ্বীপ গুলি, পেনিনসুলা, প্যাসিফিক আর ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের নীল পানি সবকিছু মিলিয়ে যেন আকাশ থেকে আমাকে চুম্বকের মত টানছে ল্যাটিন দেশের অপরূপা প্রকৃতি, তবুও আমাকে ফিরে যেতে হবে গন্তব্যে। আমি ফিরছি, প্লেনের জানালা দিয়ে দূর আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে ভাবছি এবারের অভিযাত্রার স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো।

ফিরে দেখা ল্যাটিন আমেরিকার সফরের মুহূর্তগুলি স্মৃতির পাতায় টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো আমাকে। এই নিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার মাটিতে তিনবার যাওয়া হয়েছে আমার। প্রতিবারই কোন না কোন নতুন দেশে অভিযাত্রা করেছি। এবারের সফরে ল্যাটিন আমেরিকার পাঁচটি দেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে বহু সাবধানী পায়ে হাঁটতে হয়েছে।

গুয়াতেমালার এন্টিগুয়াতে স্বাধীনতা দিবসের সেই উৎসবমুখর মুহূর্ত, হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলার মাঝে তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা টুরিস্টদের সাথে আমিও মিশে গিয়েছিলাম সেই উৎসব মুখর বিকেলে।
সবার হাতে ফ্রিডম ফায়ার, রাস্তায় রাস্তায় তারা সবাই নৃত্য করছে। হাজার হাজার বাচ্চারা তাদের ট্রাডিশনাল ড্রেস পরে বিভিন্ন ধরনের মিউজিক বাঁশি বাজিয়ে মাতিয়ে রেখেছে সেই মুহূর্তকে। আনন্দে মুখরিত সকল গুয়াতেমালার মানুষজন তখন। আমার মনে পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ সেই গানটি ”মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে”।

সেরো দে লা ক্রুজ’ অর্থাৎ ‘হিল অব দ্য ক্রস’ এন্টিগুয়াতেই অবস্থিত। যে কোন শহরে গেলেই আমি সে শহরকে খুব উঁচু থেকে দেখতে চাই তার জন্যই কয়েকশো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ছিলাম ‘সেরো দে লা ক্রুজ’। সেখানে সোফিয়া নামক ছোট্ট আদিবাসী মেয়েটি দূর থেকে আমাকে দেখে যখন দৌড়ে আসলো তাকে দেখে মনে হয়েছিল একটা ফুল পরী কি সুন্দর গায়ে তার গুয়াতেমালা ট্রেডিশনাল ড্রেস পরা।

আবার লেক আতিক লেনের অপরূপ সৌন্দর্য দেখা, আগুয়া, ফিউগো এবং প্যাচায়া নামক আগ্নেয়গিরিগুলো দেখার মুহূর্তগুলো ছিল অপূর্ব। এরমধ্যে আমার দেখা ভলকান পাচায়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভলকানো ছিলো। ভলকানো পাহাড়ের গায়ে তাঁবুর মধ্যে রাত্রিযাপনের সময় দূর থেকে দেখা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিকে দেখে মনে হচ্ছিল কোন এক পাহাড়ের বুকে ছিড়ে বেরিয়ে আসা জ্বলন্ত মশালের আলো যেন আলোকিত করছে চারপাশের পাহাড়ের ভ্যালিগুলোকে।

এল সালভাদরের ছোট্ট এল তুনকো টাউনের সামুদ্র সৈকতে জার্মান থেকে আসা নিমোর সাথে টই টই করে
ঘুরে বেড়িয়েছি, তারপর আমরা ৮ জন টুরিস্ট শাটল বাসে করে রাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে হন্ডুরাসের লা ইউনিয়নে পৌঁছেছি। কখনো বন জঙ্গলের ভেতরে চাঁদের আলো দেখতে দেখতে আবার কখনও প্রচন্ড ঝড়ের মুখে পার হতে হয়েছে হন্ডুরাসের ছোট ছোট গ্রাম নগর ও সমুদ্রপাড়ের রাস্তাগুলো।

তারপর নিকারাগুয়া অভিযাত্রা শুরুর দিকে নিকারাগুয়ার ‘সেরো নিগ্রো’ সামিটে অ্যাডভেঞ্চারের গিয়েছিলাম পকো হোস্টেল থেকে ৭ জন ফেলো টুরিস্টর সাথে। হাইকিং করে চুড়ায় উঠে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা উড়িয়েছি, আর আগ্নেয়গিরি খুব কাছ থেকে দেখা, তারপর বৃষ্টিমুখর বিকেলে উচু পর্বত সামিট থেকে ভলকানিক বোট চালিয়ে সেই খাড়া ভলকানিক পর্বত থেকে নামার অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ংকর, কিন্তু অনেক মজার।

নিকারাগুয়া ধর্মীয় শহর লেয়ন ও কোস্টারিকার কনচাল, পেনকা, হারমোচা, নাকাচকোলো, এল কোকো সমুদ্র সৈকত ছিল অপূর্ব। সমুদ্র সৈকত তীরবর্তী ছোট ছোট সামুদ্রিক টাউন ব্রাসিলিতো, প্লায়া কোকো, পেনকা, হারমোসা, তামারিন্দ সিটি জায়গা ছিল স্বর্গ রাজ্যের মত দেখতে।

ব্রাজসিলিতো নদীটি পায়ে হেঁটে পার হয়ে কনচাল সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য্য দেখতে যাওয়া আবার সেই নদীতে সাঁতার কেটে ফিরে আসা। নাকাচকোলো উপদ্বীপে- প্যাসিফিক সমুদ্রের নীল পানিতে গোল হয়ে বসে জুস খাওয়ার মুহূর্ত ছিল কোন স্বর্গরাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার মত।

এই সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলির পথে পথে অভিযাত্রা পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে অভিযাত্রাকেও হার মানিয়েছে। আমি যখনই বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকাই- তখনই ভেসে আসে সারা পৃথিবীতে ভ্রমণ করা সব নগর-বন্দর, পাহাড় সমুদ্রের চিত্রগুলি।

রাতের অন্ধকারে সীমান্তপাড়ি, পশ্চিম আফ্রিকার সাহারা মরুভূমিতে ধুলো ঝড়ে বিধ্বস্ত হওয়া, ৫৬ ডিগ্রী তাপমাত্রায় হাতের চামড়া পুড়ে যাওয়া, ইথিওপিয়াতে গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা, লাইবেরিয়া থেকে আইভরিকোস্টে যাওয়ার সময় ১৩ টা কূপ পার হয়ে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করা, মধ্যরাতে আফ্রিকার গিনি কোনাক্রির জঙ্গলে আটকা পড়ে বেঁচে থাকা, আফ্রিকাতে তিনমাস ইয়াম আলু খেয়ে বেঁচে থাকা, কখনো শুধু আখের রস খেয়ে দিন পার করা কিউবার রাস্তায়, কখনো ২৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা!

উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডা যাওয়ার পথে প্রচন্ড বৃষ্টিতে বন্যপ্রাণীর জঙ্গলের মধ্যে বাস এক্সিডেন্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, আবার কিরগিস্তানের আলা আরচা মাউন্টেন থেকে ফেরার সময় যখন উচু পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে বুনো এক গাছ ধরে ঝুলে ছিলাম বাঁচার জন্য, আবার অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে সমুদ্রের স্কুবা ডাইভিং এর সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পেটের মধ্যে চলে যেয়েও বেঁচে ছিলাম সব প্রতিকূলতা অসম্ভবকে অতিক্রম করে!

কিন্তু প্রথমবারের মতো যখন গুয়াতেমালার রাস্তায় কোন মানুষ ছুরি তাক করে আমার জীবন নিয়ে নিতে চেয়েছিল মুহূর্তেই আবার আমি বেঁচে গেলাম কোন এক অজানা আশীর্বাদে!
১৯ বছর আগ থেকে যখন বিভিন্ন দেশ সফরের সময় বাংলাদেশের একটি লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে প্রতিটি দেশের পাহাড়ে অচেনা নগরে সমুদ্র সৈকতে আমি গেয়ে উঠেছি-
”আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি”- তখন যেন কোন কষ্টই আমাকে আর স্পর্শ করতে পারেনি।

পাঁচবার আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। উঁচু পর্বত শৃঙ্গে অভিযাত্রার সময় এবং সমুদ্রের তলদেশের জলজ জীবন দেখার সময় প্রকৃতি অনেকবারই আমার প্রাণ নিতে নিতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তাই এই ল্যাটিন এর দেশ গুয়াতেমালা শহরে রক্তাক্ত হয়েও থেমে থাকেনি আমার পদযাত্রা। পৃথিবীর সকল কঠিন পথ অতিক্রম করার সময় আমি প্রতি মুহূর্তে শিখছি এই পৃথিবীর কাছে, আর দেখে নিয়েছি এই পৃথিবীর রুপকেও।

সব কিছুর মাঝেও হাজারো অপরিচিত মানুষের সাথে নতুন করে পরিচয় হওয়া যোগ বন্ধন যেন আমাকে বারবার মনে করে দিচ্ছে এরা আর কেউ নয় সবাই একই পৃথিবীর একই ঘরে বসবাসকারী ‘পৃথিবী’ নামক একই মায়ের সন্তান! আপূর্বা পৃথিবীর কোন চিত্র যদি ভেসে আসে আমার চোখে তাহলে ক্যারিবীয় এবং প্যাসিফিক সমুদ্রের মাঝখানের মানচিত্রের এই দেশগুলো।

গুয়াতেমালার এল সালভাদর, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা ছিল আমার এবারের বিশ্ব ভ্রমণ অভিযাত্রায় যোগ হওয়া কয়েকটি দেশ। সমুদ্র সৈকত, সমুদ্রের পানি, পেনিনসুলা, দ্বীপ-উপদ্বীপ, সবুজ গাছপালা, প্রাণী, পাহাড়ের উপর জমে থাকা মেঘ, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, অপূর্ব লেক সবকিছুই মধ্যে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম কিছুদিন এই দেশে গুলোর সীমারেখার মধ্যে। পৃথিবীতে এইসব লুকায়িত নিসর্গকে দেখার জন্য বাংলাদেশের পতাকা হাতে আমি নেমে পড়েছিলাম পৃথিবীর পথে পথে বহু বছর আগে। আজ ধীরে ধীরে আমি পার হয়েছি ১৩৫ টি দেশের সীমান্ত।

বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে যখন আমি পৃথিবীর পথে পথে নেমে পড়েছিলাম পুরো পৃথিবীকে দেখবো বলে তখনও হয়তো আমি জানতাম না এই পৃথিবীর কাছ থেকে আমি এত কিছু শিখতে পারবো। এই পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার জন্য এতটা দুরূহ পথ পাড়ি দিতে হবে। আর এইসব পথ পাড়ি দিতে দিতেই আমি বাঁচতে শিখবো সকল প্রতিকূলতার মাঝে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *