লিড নিউজ সারা বাংলা

অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই মাদক সম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: অপরাধীদের সংশোধনের জায়গা হলো কারাগার। অথচ সেই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা কারাগারে থেকে অবাধে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসা। একই সঙ্গে তারা নিয়মিত মাদকসেবনও করে যাচ্ছে। মাদকসেবন ও ব্যবসায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন কারাগারগুলোতে দায়িত্বে থাকা শতাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী— এমন অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারগুলোতেও মাদকসেবন ও পাচারে জড়িতদের শাস্তি দিতে তদন্ত চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ইয়াবা সম্রাট হীরা মাঝি ও নান্নু মৃধা বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে নান্নু মৃধা একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ও হীরা মাঝি একটি মাদক মামলায় এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

এ দুই মাদক সম্রাটের অবর্তমানে হীরা মাঝির ভাই ও তার শতাধিক সহযোগীরা এবং নান্নু মৃধার অবর্তমানে তার স্ত্রী ও স্বজনরা মাদক ব্যবসা মাঠে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করছে। এর মধ্যে গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে র্যাব-৮-এর চৌকস সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১৪৫ পিস ইয়াবাসহ গৌরনদীর কটকস্থল গ্রামের বার্থী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে মাদক সম্রাট হীরা মাঝির ভাই মনির মাঝিকে আটক করেছে। এ ঘটনায় র্যাবের ডিএডি আল মামুন সিকদার বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। একই দিন রাতে মাদকের বিরুদ্ধে নীরবে জেহাদ ঘোষণা করা গৌরনদী মডেল থানার চৌকস ওসি গোলাম ছরোয়ারের নেতৃত্বে বেজগাতি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক সম্রাট নান্নু মৃধার স্ত্রী হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গৌরনদী মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ায় ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে উপজেলার নন্দনপট্টি গ্রামের শফিজউদ্দিন মৃধার পুত্র মাদক সম্রাট নান্নু মৃধা ও তার সহযোগীরা একই গ্রামের খাদেম সরদারকে কুপিয়ে হত্যা ও তার পুত্র আসলাম সরদারকে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেয়। ওই মামলায় আসামিদের উপস্থিতিতে ২০১৮ সালের ৭ মার্চ আদালতের বিচারক নান্নু মৃধাকে ফাঁসির আদেশ ও তার সহযোগী সেন্টু মৃধা এবং আলম মৃধাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নান্নু মৃধার কাছে ইয়াবা তৈরির দুটি মেশিন ছিল, যা এ পর্যন্ত খুঁজে পাননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মাদক সম্রাট নান্নু মৃধা গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন এ অঞ্চল শান্ত ছিল। পরবর্তীতে কারাগারে থাকা নান্নু মৃধার দিকনির্দেশনায় পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করেন তার (নান্নু) স্ত্রী হাসিনা বেগম ও তার স্বজনরা। কৌশলে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ইয়াবার চালান আসে হাসিনা বেগমের কাছে। সম্প্রতি সময়ে স্থানীয় যুবসমাজ ইয়াবার চালান পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে এক ব্যক্তিকে আটক করে চরম রোষানলে পড়েছিলেন।

এ ব্যাপারে থানার ওসি গোলাম ছরোয়ার বলেন, সময়মতো সঠিক তথ্য না পাওয়ায় এত দিন হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

সূত্রমতে, নান্নু মৃধার অবর্তমানে গৌরনদীসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের ইয়াবা ডিলার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কটকস্থল গ্রামের ইঙ্গুল মাঝির পুত্র হীরা মাঝি ও তার সহোদর মানিক মাঝি। তারা দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য ও জাল টাকা আমদানি করে নিজস্ব সহযোগীদের মাধ্যমে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরবরাহ করে আসছিল।

সূত্রে আরও জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ইয়াবা সম্রাট মানিক মাঝি ও তার সহোদর হীরা মাঝি এবং তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করায় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পরেন গৌরনদী মডেল থানার সাবেক ওসি ফিরোজ কবির। যে কারণে মাত্র চার মাসের মধ্যে গৌরনদী থানা থেকে বদলি করা হয় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে সফলতা অর্জন করা ওসি ফিরোজ কবিরকে। পরবর্তীতে একটি বিশেষ মহলের অপতৎপরতায় তার (ফিরোজ কবির) বিরুদ্ধে নাটকীয়ভাবে দুদক দিয়ে একটি মামলা দায়েরও করানো হয়েছিল। এ কারণে মাদক সম্রাট মানিক ও হীরা মাঝিকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে সাহস দেখায়নি পুলিশ প্রশাসন।

এরই মধ্যে ২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে র্যাব-৮-এর চৌকস সদস্যরা মাদক সম্রাট হীরা মাঝি, তার সহযোগী বিপ্লব বেপারি ও পলাশ কুমার মিত্রকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ছয় রাউন্ড অ্যামোনিশন, তিন হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১২২ বোতল ফেনসিডিল, চার কেজি গাঁজা, দুই বোতল বিদেশি মদ, ২৫ হাজার জাল টাকার নোট, মাদক বিক্রির ৫৬ হাজার ৭৮৫ টাকা, ১২টি মোবাইল সেট ও ১১টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় র্যাব-৮ এর সিপিএসসির ডিএডি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। এরই মধ্যে পূর্বের একটি মামলায় হীরা মাঝিকে এক বছরের সাজা প্রদান করেন আদালতের বিচারক।

সূত্রমতে, হীরা মাঝি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তার সহোদর মানিক মাঝির মাধ্যমে পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করে। মানিক মাঝি মাহিলাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে থেকে সহযোগীদের মাধ্যমে মাদকের রমরমা ব্যবসা শুরু করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১৯ মার্চ র্যাব-৮-এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে মানিক মাঝিকে আটক করেন। এ সময় ৩৫৫ পিস ইয়াবা, ১০৫ বোতল ফেনসিডিল এবং মাদক বিক্রির নগদ এক লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র্যাব-৮-এর সিপিএসসির ডিএডি মামুনুর রশিদ খান বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

সূত্রে আরও জানা গেছে, হীরা মাঝির পর মানিক মাঝিও গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকার সুবাদে মাদক ব্যবসার পুরো দায়িত্ব পালন করে তাদের ছোট ভাই মনির মাঝি। চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে র্যাব-৮-এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ মনির মাঝিকে আটক করেছে। বর্তমানে হীরা মাঝিসহ তার অপর দুই ভাইয়ের অবর্তমানে তাদের অন্যান্য সহযোগীরা নীরবে মাদকের রমরমা ব্যবসা করে আসছে।

এদিকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সদ্য জামিনে বের হওয়া নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তিরা জানায়, মাদক সম্রাট নান্নু মৃধা ও হীরা মাঝি কারাগারে থেকে তাদের সহযোগীদের মাদক ব্যবসার কৌশল সম্পর্কে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

প্রশাসনের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে রহস্যজনক কারণে কয়েক সংবাদকর্মী পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে আপত্তিকর সংবাদ প্রকাশ করে অভিযানের গতি কমিয়ে দিচ্ছেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ওই সংবাদের জেরধরে তদন্তের নামের একের পর এক থানা পুলিশকে হয়রানি করায় মাদকের বড় ধরনের অভিযানে নামতে চাচ্ছেন না থানা পুলিশ।

এ ব্যাপারে গৌরনদী মডেল থানার ওসি গোলাম ছরোয়ার জানান, মাদককে কোনো ছাড় নয়। মাদক কারবারিরা পুলিশের জালে ধরা পড়বেই। একসময় মাদক ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। ওই সব ব্যবসায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে থাকায় মাদক ব্যবসা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ওসি আরও জানান, এখনো যারা আত্মগোপনে থেকে মাদক ব্যবসা করছে তাদের গ্রেপ্তারের জন্যও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *