বিশেষ প্রতিবেদন

ঋণের জালে বন্দি জীবন, মুক্তি সমুদ্রযাত্রায়

বিএনএন ৭১ ডটকম
ডেস্ক: দিন আনে দিন খায় মানুষের কষ্টের সীমা নেই। প্রতিনিয়ত চলে তাদের জীবন সংগ্রাম। কষ্টের বেড়াজালে বন্দি এসব মানুষের জীবনে সুখ বলে কিছু নেই। বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ! অভাবের কারণে এসব মানুষেরা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জীবিকা চালান। তাই মহাজনের কাছে তারা ঋণী। এ দায় থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্রযাত্রা করতেই হয়। এ তালিকায় উপরের দিকে রয়েছে সুন্দরবনের আশপাশ ও খুলনার উপকূলীয় এলাকার জেলেরা।

তারা এখন সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। এবার পাঁচ মাসের জন্য সমুদ্রযাত্রা করবে তারা। তবে এ যাত্রা নিয়ে জেলেরা আতঙ্কেও আছেন। কারণ নদী ভাঙনকবলিত এলাকার জেলেরা পাঁচ মাস পর ফিরে এসে বসতভিটা ও রেখে যাওয়া পরিবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে পাবেন কিনা, সেই আতঙ্কে রয়েছেন। এসব জেলের আবাসস্থল জেলে পল্লিগুলো রয়েছে নদী ভাঙন ঝুঁকিতে। এসব নানা সংকট থাকলেও ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে তাদের সমুদ্রযাত্রা করতেই হবে। এসব নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হয় সেখানকার জেলেদের।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মাহামুদকাঠি, হেতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর, কাঠিপাড়া গ্রামের জেলে পল্লিতে এমন আতঙ্কের মধ্যেই চলছে সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি। কেউ নতুন করে নৌকা গড়ছেন, কেউ পুরাতন নৌকা মেরামত করছেন, আবার কেউ জাল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দিন-রাত খাটছেন জেলেরা। আগামী ২২ অক্টোবর (বাংলা ২ কার্তিক) তাদের সমুদ্রযাত্রা। পাঁচ মাসের জন্য তারা ঘর ছাড়বেন। ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা পার করে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে যাবেন বঙ্গোপসাগরে। তাদের অবস্থান হবে সুন্দরবন সংলগ্ন আলোর কোলসহ আশপাশের চর এলাকা। সাগরে মাছ ধরবেন আর এ চরে এসে শুকাবেন। মার্চের দিনগুলো পর্যন্ত এভাবে চলবে।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলে সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাইকগাছার হিতামপুর গ্রামে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে রয়েছে দেড় শতাধিক জেলে পরিবার। খেয়াঘাট এলাকায় জেলেরা নতুন নৌকা তৈরি ও পুরাতন নৌকা ঠিকঠাক করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।

হিতামপুর খেয়াঘাট এলাকার জেলে তপন মণ্ডল জানান, একটা নৌকা তৈরিতে কমপক্ষে ৪০ দিন সময় লাগে । মিস্ত্রি লাগে চারজন। খরচ হয় কমপক্ষে চার লাখ টাকা। নৌকা বানানোর মজুরি লাগে লাখ টাকার ওপরে। নৌকা ও জাল মেরামত, দড়ি বানানো, তেলের জন্য ড্রাম প্রস্তুত, পুরনো নৌকা ও যন্ত্রাংশ দেখে নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করছেন এখন তারা। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করার লোকও ঠিক করতে হচ্ছে।

নৌকা তৈরির জন্য গোপালগঞ্জ থেকে আসা মিস্ত্রি মিলন বালা বলেন, ‘খই (বাবলা) ও মেহগনি কাঠে তৈরি হয় নৌকা। একটি নৌকা তৈরিতে সব মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হয়।’
রামনাথপুর গ্রামের মনিশংকর বিশ্বাস বলেন, ‘৪২ হাত লম্বা ও ১২ হাত চওড়া নৌকা নিয়ে সমুদ্রে যাই। প্রতি নৌকায় ৮ থেকে ১০ জন জেলে থাকেন। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সাগরে অবস্থান করবেন। নৌকা তৈরি এবং দীর্ঘ সময় নিজ ও পরিবারের খরচ সামলাতে জেলে পরিবারে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। তাদের কোনও ব্যাংক ঋণ দেয় না। সরকারি সহায়তাও পান না। তাই মহাজনের কাছ থেকে দাদন (ঋণ) নিতে বাধ্য হন। সমুদ্রযাত্রার আগে তো বটেই, সারা বছরই মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের চাপ তো থাকেই।’

দীনবন্ধু বিশ্বাস নামে এক জেলে বলেন, ‘সাগরযাত্রায় থাকে জীবনের ঝুঁকি। কিন্তু মহাজনের ঋণ শোধ করতে হলে সাগরে যেতে হবে। বিকল্প কিছু নেই। সাগরে মাছ ধরার আয়ে ঋণ শোধ হবে। ফিরে এসে আবার মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জীবন-জীবিকা চালাতে হবে। এ অবস্থা থেকে জেলেদের মুক্তি নেই।’ৎ
তিনি বলেন, ‘কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে থাকবে বসতভিটা। আর আমরা থাকবো সাগরে। এ চরম বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের জীবনযাপন। দিশেহারা অবস্থার মধ্যেই নিত্য নতুন দিশা খুঁজতে হচ্ছে আমাদের।’

কাটাখালী জেলে পল্লির পঞ্চানন বিশ্বাস বলেন, ‘খাওয়া, জেলেদের মজুরিসহ ট্রলারপ্রতি খরচ কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা না থাকায় ওই টাকা চড়া সুদে নেন তারা। মৌসুম শেষে লাভের টাকা সুদ পরিশোধেই শেষ হয়। আর যাদের কাছ থেকে দাদন নেওয়া হয় তাদের কাছে কম দামে শুঁটকি বিক্রি করতে হয়। স্বল্প মেয়াদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা পেলে জেলেরা লাভবান হতে পারতো।’

Courtesy: বাংলা ট্রিবিউন

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *