বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

যানজটে মহামারী!

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত শহরেই রাস্তা অনুযায়ী কত যানবাহন চলতে পারবে ওই হিসাব করে নিবন্ধন দেয়া হয়। ওসব দেশে একটি গাড়ি নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় অন্য নতুন গাড়ি নামানোর অনুমতি মেলে না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাতিক্রম যে কেউ ইচ্ছা করলেই রাস্তায় গাড়ি নামানোর সুযোগ পাচ্ছে। দিব্যি পাচ্ছে যাচ্ছে বিআরটিএর নিবন্ধনও। রাষ্ট্রীয় যানবাহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ তথ্যানুযায়ী ১০ বছরে রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে ৩ গুণ। আর ৯ বছরে সারাদেশে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে আড়াইগুণের কিছু বেশি। ওই সময়ে দেশে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটরবাইক। ঢাকার মোট যানবাহনের প্রায় অর্ধেকই মোটরবাইক।

বর্তমানে দেশজুড়ে মোট যানবাহনের চার ভাগের প্রায় তিন ভাগের কাছাকাছি মোটরবাইক চলছে। গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩৯ লাখ ২৭ হাজার ৭০২। একই সময়ে রাজধানীতে নিবন্ধিত পরিবহনের সংখ্যা ১৪ লাখ ১০ হাজার ৫৬৭। সব মিলিয়ে পরিবহনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঝুঁকির মাত্রাও। বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানী ঢাকায় রাস্তা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩ লাখ যান চলাচল করতে পারে। কিন্তু অপরিকল্পিত যানবাহনের নিবন্ধন দেয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে সড়ক-মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নানা উদ্যোগের পরও সড়ক দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরেও আরো কয়েক লাখ যানবাহন ঢাকায় চলাচল করছে। এর বেশিরভাগই মোটরসাইকেল ও স্থানীয়ভাবে নির্মিত হিউম্যান হলার বা লেগুনাসহ ইজিবাইক।

বিআরটিএ ২০ ধরনের যানবাহনের হিসাব সংরক্ষণ করে। তার মধ্যে কার, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল-এসইউভি (জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাসকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাস-ট্রাকসহ অন্য সব যানবাহন বাণিজ্যিক যানের আওতাভুক্ত। বর্তমানে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক গাড়ি পার্কিং ও চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ঢাকার যানজট দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সূত্র জানায়, বিগত ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১২। ২০১০ সালে ৭৬ হাজার ১৬৫ গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১১ সালে নিবন্ধিত হয় ৭২ হাজার ৯৪৭, ২০১২ সালে ৫৯ হাজার ৫৭৩, ২০১৩ সালে ৫৪ হাজার ৪৯২, ২০১৪ সালে ৭৩ হাজার ৫১ নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১৫ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা হয় ৯ লাখ ৫ হাজার ৭৪২, ২০১৬ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৫২০, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৮, ২০১৮ সালে ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৯ ও চলতি বছরের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৪ হাজার ৬৭ যানবাহন।

সব মিলিয়ে এখন ঢাকায় নিবন্ধিত পরিবহন ১৪ লাখ ১০ হাজার ৫৬৭। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে বিআরটিএ যেভাবে গাড়ির নিবন্ধন দিয়েই যাচ্ছে তা অবৈজ্ঞানিক। ঢাকায় যত গাড়ি চলছে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর মাধ্যমে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে কোন সমন্বয় থাকছে না, তাই যানজট বাড়ছেই। লোকজন ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে তখনই ছুটছেন যখন তারা গণপরিবহনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।

গণপরিবহন উন্নত হলে ব্যক্তিগত গাড়ির এতো চাহিদা থাকতো না। তাতে যানজট কিছুটা হলেও কমতো। আর এমন পরিস্থিতি থেকে একদিনে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তার জন্য কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। বছরে কি পরিমাণ যোগান আছে সে অনুসারে গাড়ির নিবন্ধন করাতে হবে। যানবাহনের ঢালাও নিবন্ধন করতে দেয়া যাবে না। পাশাপাশি গণপরিবহনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সড়কে চলতে লোকজন যখন বিকল্প গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহন পাবেন তখন গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত হবে।

সূত্র আরো জানায়, একটি শহরে যেখানে যানবাহনের চলাচল ও ব্যবস্থাপনার জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক দরকার, সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে যানজট হবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিভিন্নস্থানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় লোকজন সড়কের ওপরই গাড়ি রাখছেন, যা যানজট বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ।

এদিকে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ উপলক্ষে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, এককভাবে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে নয়। সেজন্য মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বিআরটিসি, পুলিশসহ সবার অংশগ্রহণ জরুরি। তাছাড়া যার যেটা দায়িত্ব তা যদি সঠিকভাবে পালন করা হয় তাহলে দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *