বিশেষ প্রতিবেদন লিড নিউজ সারা বাংলা

গবেষণায় উদ্ভাবিত অধিকাংশ উফশী ধানের জাত মাঠে নেই

বিএনএন ৭১ ডটকম
কৃষিবিজ্ঞানীরা বিপুলসংখ্যক উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করলেও চাষের জন্য তা মাঠে নেই। অথচ এ খাতের গবেষণায় রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। গবেষণায় প্রতিটি জাতের ধানের ফলন হেক্টরে গড়ে ৮ থেকে ১০ টন বলা হলেও কৃষক চাষ করে পাচ্ছে হেক্টরে ৪ টনের সামান্য বেশি। বিগত ৪৫ বছরে উদ্ভাবিত ধানের ১১৫টি জাতের মধ্যে কৃষকের কাছে মাত্র ৫টি জনপ্রিয় হয়েছে। বাকিগুলোর কোনো হদিস নেই। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে। কিন্তু ওসব জাতের ধানের উৎপাদন কৃষকের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। কৃষক এখনো পুরনো আমল থেকে চাষ করে আসা ধানের জাতগুলোই আবাদ করে যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ১৯৭২ সাল থেকে দেশি ধানকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনের পথে যাত্রা শুরু করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-ব্রি ৯৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। আর পরমাণু কৃষি গবেষণা সংস্থা-বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন জলবায়ুসহিষ্ণু মোট ২১টি ধানের জাত। তার মধ্যে রয়েছে লবণসহিষ্ণু ৯টি, খরাসহিষ্ণু ২টি ও বন্যাসহিষ্ণু ৪টি জাত। তাছাড়া বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্ক-সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ৯৪টি জাতের মধ্যে বোরো মৌসুমে বিআর-২৮ ও ২৯ কৃষক চাষ করে। ওই দুটি জাত সারাদেশেই কৃষকের কাছে জনপ্রিয়। আর আমন মৌসুমে কৃষকরা বিআর-১১ ও বিআর-৪৯ জাত চাষ করে। এ জাত দুটির ফলন হেক্টরে সবোচ্চ ৩ থেকে ৪ টন। তাছাড়া বিনা উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও বিভিন্ন ঘাতসহিষ্ণু ২১টি জাতের মধ্যে কৃষকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে শুধু বিনা-৭।

নতুন ধানের জাতগুলো কৃষকরা আগ্রহ নিয়ে চাষ করে ফলন কম পায়। ফলে তারা নতুন জাতে উৎসাহী হচ্ছে না। পাশাপাশি জনপ্রিয় ও ভালো ফলন দেয়া জাতগুলো এখন ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে ঘাতসহিষ্ণু জাতগুলো কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র জানায়, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্ভাবিত দেশের ধানের আবাদে ভালো ফলন না পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা বিদেশি জাত স্বর্ণা, জিরাশাইল, নেপালি পাইজম আবাদের দিকে ঝুঁকছে। সারাদেশে অঞ্চলভেদে কৃষকরা ওই রকম ২২টি জাতের ধানের চাষ করে। ওসব জাতের ধানে ফলন যেমন বেশি, তেমনি ধান পাকতেও সময় লাগে কম। ব্রি উদ্ভাবিত ধানগুলো পাকতে ১২০ থেকে ১৩০ দিন সময় নিলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর ধানের জাতগুলো চাষ করে ১১০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। তবে সীমান্তপথে পাচার হয়ে আসা ওসব জাতের মাধ্যমে দেশে ধান ও গমে ব্লাস্ট রোগের বিস্তার ঘটছে। তাছাড়া অভিযোগ রয়েছে বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনীহা এবং হাইব্রিডের দাপটে গবেষণার সাফল্য কৃষকের মাঠে যাচ্ছে না। অথচ মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ৪৮টি হাইব্রিড জাতের ধান।

ওসব ধানের বাজারমূল্য কম এবং উৎপাদন খরচও বেশি। কিন্তু ‘কৃষি কর্মকর্তারা হাইব্রিড ধান ও বিদেশি কোম্পানির বীজ আবাদ করতে বেশি পরার্মশ দিচ্ছে। কিন্তু দেশি জাতগুলো সম্পর্কে কৃষকদের জানাচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এদেশের কৃষি গবেষণা ও উৎপাদন কার্যক্রম ঠিকমতো এগুচ্ছে না। ফলে কৃষকরা নতুন নতুন অজানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন ধানে কোল্ড ইনজুরি, বিএলবি, ব্লাস্ট, বিএলএসএস ও চিটা রোগ হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত জাতের চেয়ে সীমান্ত অঞ্চলে অন্য দেশের ধানের আবাদ বেশি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি বিজ্ঞানীদের দেশের খরাপ্রবণ ও জলাবদ্ধতা, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের উপযোগী অধিক ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করার পাশাপাশি উৎপাদনে সেচ ও অন্যান্য উপকরণ খরচ কম হওয়ার দিকে নজর দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে ধানের উচ্চফলনশীল জান প্রসঙ্গে ব্রি’র মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর জানন, ব্রি উদ্ভাবিত ধানের মধ্যে উচ্চফলনশীল ৮৮টি আর হাইব্রিড ৬টি। অল্প সময়ে অনেক বেশি জাত উদ্ভাবন হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৪৩টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। আর কৃষক যে জাতগুলো পছন্দ করে বিএডিসি সেগুলোই নিয়ে যায়। তার বাইরে ব্রি বীজ সরবরাহ করে না। সরকার নতুন জাতগুলো কৃষকের কাছে নিয়ে যেতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে ৬০ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ দিয়েছে। এ বছর থেকে নতুন জাতগুলো কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। দ্রুতই উচ্চফলনশীল জাতগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে যাবে। প্রিমিয়াম মানের চিকন চালের জন্য বিআর-৫০, বিআর-৫৭, বিআর-৬৩, বিআর-৭৫, বিআর-৮০, বিআর-৮১, বিআর-৮৪ ও বিআর-৮৬ উদ্ভাবন করা হয়েছে। সেগুলো ভালো ফলন দেবে। আর বিআর-২৮ ও ২৯ এর বিকল্প হিসেবে ব্রি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। সেগুলোও মাঠে গেলে কৃষক উৎসাহী হয়ে আবাদ করবে।

অন্যদিকে এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মীর নুরুল আলম জানান, কৃষক সঠিকভাবে চাষ করতে পারেন না বলেই ফলন বেশি হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। কৃষক যাতে ভালো ফলন পায় সেজন্য সারাদেশে মাঠপর্যায়ে আরো বেশি প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি গবেষকদের জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৃষকের উৎপাদনশীলতার দিকেও নজর দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসিরুজ্জামান জানান, নতুন কোনো জাত সম্পর্কে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা বলেন জাতটি ৮ টন ফলন দেবে; কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ওই জাত থেকে ৪ টন ফলনও পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কেন ফলন হয় না তা নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের নামে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় বন্ধে গবেষকদের কৃষক ও দেশের আবহাওয়া উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবনের দিকে নজর দেয়া জরুরি। আর জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন নতুন ধান উদ্ভাবনও গুরুত্বপূণ।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, এত এতো জাত উদ্ভাবিত হচ্ছে কিন্তু ব্রি-২৮ ও ২৯ ছাড়া অন্য কোনো জাত কেন মাঠে যাচ্ছে না, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। উদ্ভাবিত নতুন নতুন ধানের জাত কৃষকের কাছে নিয়ে যেতে সমন্বিত কার্যক্রম নিতে হবে। অঞ্চলভেদে কৃষকের কাছে জনপ্রিয় জাতগুলো পৌঁছাতে হবে। কম সময়ে বেশি ফলন দেয় এমন জাতের উদ্ভাবন করতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *