বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে

ড. হারুন রশীদ
জনপ্রশাসনে পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি উপসচিব হলেন ২৫৬ কর্মকর্তা। উপসচিব পদে পদোন্নতির মাধ্যমে আগামি নির্বাচন সামনে রেখে জনপ্রশাসনে তিন স্তরে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো। এর আগে গত ২৯ আগস্ট ১৬৩ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব ও ২০ সেপ্টেম্বর ১৫৪ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা দেশের সেবক। জনগণের অর্থ থেকেই তাদের বেতন-ভাতা ও যাবতীয় খরচ মেটানো হয়। তাই সরকারি কর্মচারীদের তাদের দায়িত্ব পালনকালে সর্বদা নিরপেক্ষ হতে হবে। দেশে এমন একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে পারেন, তবে উপসচিব পদে এর আগে বড় ধরনের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি। ওই সময় ৪২৪ জন কর্মকর্তা উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। উপসচিব থেকে ওপরের পদগুলো সরকারের পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, পদোন্নতির পর এখন উপসচিবের সংখ্যা হলো এক হাজার ৭৯০ জন। উপসচিবের নিয়মিত পদ এক হাজার ছয়টি। প্রশাসনে উপসচিব পদে এমনিতেই নিয়মিত পদের চেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা রয়েছেন। তার ওপর আবার নতুন করে পদোন্নতি দেওয়া হলো। এতে প্রশাসনে আরো বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের অনেককেই আগের পদে (ইনসিটো) কাজ করতে হবে। স্থায়ী পদ না থাকলেও পদোন্নতি দেওয়ায় পিরামিড প্রশাসন থেকে এখন মাথাভারী প্রশাসনে রূপ নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন দেওয়া হবে ওপরের পদের জন্য আর তিনি কাজ করবেন নিচের পদে, এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। আর উপযুক্তদের পদায়ন করা হবে, এটাও তাদের অধিকার। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

শুধু পদোন্নতিই শেষ কথা নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত তাদের দায়িত্ব পালনকালে জনগণের কল্যাণকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। তাদের রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদানের সময় কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এর ফলে সরকারি প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

জনকল্যাণমূলক নানা ধরনের প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অথচ সরকারি কর্মকর্তারা দেশের সেবক। জনগণের অর্থ থেকেই তাদের বেতন-ভাতা ও যাবতীয় খরচ মেটানো হয়। তাই সরকারি কর্মচারীদের তাদের দায়িত্ব পালনকালে সর্বদা নিরপেক্ষ হতে হবে। দেশে এমন একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে পারেন। তাঁদের অবশ্যই ঔপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণা বিসর্জন দিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে জনকল্যাণে কাজ করতে হবে এ লক্ষ্য থেকে তাদের এতটুকু বিচ্যুত হলে চলবে না।

জনগণের দ্বারপ্রান্তে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দ্রব্যমূল্য, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ের ওপর। প্রত্যেকে তার নিজ নিজ দায়িত্বের মধ্যে থেকে কাজ করলে কোনো সমস্যা হয় না। সীমা অতিক্রম করলেই দেখা দেয় সমস্যা। এ ছাড়া প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণেও অনেক উন্নয়ন কর্মকা- সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। এমনকি অনেক সময় উন্নয়ন বরাদ্দ ফেরত আসার ঘটনাও ঘটে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সবার আগে দেশের স্বার্থকে স্থান দিলে যেকেনো সংকট উত্তরণ সহজ হয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে জনপ্রত্যাশার এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা মতামত থাকতেই পারে। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা উচিত নয়। এটা অবশ্যই গণতন্ত্রের পরিপন্থী। সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত তাদের সরকারি দায়িত্ব পালনকালে জনগণের কল্যাণকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। তাদের রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত, কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তাদের তাঁদের দলীয় তৎপরতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট না করা। দেশের সর্বত্র প্রশাসন ও সরকারি কর্মতৎপরতাকে এতটুকু দলীয়করণ করা যাবে না। বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দেশে সুশাসনের ঘাটতির জন্য তিনটি প্রধান অন্তরায় রয়েছে বলে মনে করা হয়। এগুলো হচ্ছে জনপ্রশাসনে দক্ষতার অভাব, মাঝেমধ্যেই দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। এ কথা ঠিক যে সুশাসন ও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রয়াস প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সুষম ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

জনপ্রশাসনের দক্ষতার ওপরই আসলে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি নির্ভর করে। আমাদের দেশে সচিবালয়কেন্দ্রিক যে এককেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাতে উন্নয়ন অগ্রগতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তা। কাজেই এখানকার কাজের গতিশীলতা, দক্ষতা, অনিয়ম দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশই আসলে দেশের উন্নতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এজন্য প্রশাসনকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার, জনপ্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কৌশল গ্রহণপূর্বক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাটাও জরুরি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, সংস্কার এবং তা যুগোপযোগী করা জরুরি। এ ছাড়া মানুষ যাতে যথাসময়ে বিচার পায় সে জন্য বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান করতে হবে।

জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে সরকারকে নিরন্তর সচেষ্ট থাকতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কিংবা উন্নয়নের জন্যও সম্ভাব্য সব উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এভাবে মানুষের মধ্যে একটি নিরাপত্তা বোধ সৃষ্টি করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া মানুষের আয় বাড়াতে হবে। এজন্য বেকারত্ব হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হবে। এজন্য শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। কূপম-ূকতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থায়ই আসলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। এজন্য উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে হবে। ইতোমধ্যে তিন হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়েছে। এভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আরো উন্নয়ন ঘটাতে হবে। দেশকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পের দিকে নিয়ে যেতে হবে। দেশের মানুষের প্রতি অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *