বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর জাবি

মো. শরীফুল ইসলাম নকিব

জাবি: হেমন্তের শীতের সকালে সোনামাখা রোদে তারা ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে সাই সাই করে। আবার পরক্ষণেই ঝপাৎ করে বসে যাচ্ছে জলাশয়ের অপরূপ নির্মল স্বচ্ছ জলাধারে। কেউবা আবার সাঁতার কাটছে আপন মনে জলাশয়ের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। অদূরে আবার লম্বা ঠোঁটওয়ালা শামুক ভাঙ্গা পাখি জলাশয় পাড় থেকে খুঁটে খুঁটে শামুক খাচ্ছে। পানকৌড়ি, দুগ্ধধবল বকেরা জলাশয়ের লাল শাপলা শোভিত পাতার গা বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে এখান থেকে ওখানে। এই মনোরম দৃশ্য দেখতে আপনাকে আসতে হবে ঢাকা শহরের অদূরে সাভারে অবস্থিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে।

অসংখ্য গাছপালা, জলাশয়, বাহারি ফুল আর অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতিরা এই বিশাল ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুনে। এ সৌন্দর্য যেন প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। যা শুধু সৌন্দর্য প্রিয় মানুষ নয়, আকৃষ্ট করে পাখিদেরও। তাইতো প্রতি বছর ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অতিথি পাখিরা বাংলাদেশের এ অভয়ারণ্যটিকে বেছে নেয় নির্বিঘ্নে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। বছর না ঘুরতেই আবারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার ভবনের সামনের জলাশয়, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হল সংলগ্ন জলাশয় এবং ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের জলাশয়ে অতিথি পাখির পদচারণা চোখে পড়ার মত। মূলত অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের প্রথম দিকেই ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করে অতিথি পাখি। মার্চের শেষ দিকে তারা আবার নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। এ স্বল্প সময়টুকুতে ক্যাম্পাসের জলাশয় গুলোতে তারা নির্ভাবনায় মেতে উঠে ডুব সাঁতার, চক্রাকারে উড়ে বেড়ানো, খোশ গল্প বা জলকেলীতে। দেখা মেলে জুটিবদ্ধভাবে নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতেও। পাখিদের দিনযাপনের নানা খুনসুটি বেশ উপভোগ্য দর্শকদের কাছে।

এ সময়টাতে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, প্রিয়জনসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক ক্যাম্পাসে আসে অতিথি পাখিদের ডুঁবসাতার, জলকেলি দেখার জন্য। শীতে ক্যাম্পাসে যেসব প্রজাতির পরিযায়ী পাখির সমারোহ দেখা যায় তাদের মধ্যে লেঁজা হাঁস, খুন্তে হাঁস, পিয়ঙ হাঁস, ভূঁতি হাঁস উল্লেখযোগ্য। শীতকালীন এসব পরিযায়ী পাখিগুলো সাধারণত সাইবেরিয়া, হিমালয়, কাশ্মীর ও চীন থেকে আসে। ১৯৮৮ সালে জাবি ক্যাম্পাসে সর্বপথম পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে শীতকালে সাড়ে দশ হাজার পরিযায়ী পাখি ক্যাম্পাসের জলাশয় গুলোতে আসে।

এছাড়া শীতের পরিযায়ী পাখি ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৩০ প্রজাতির দেশীয় পাখি সারা বছর দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮০ হেক্টর জায়গায় বর্তমানে ১৮৯ প্রজাতির পাখি রয়েছে, যা বাংলাদেশে প্রাপ্ত পাখির প্রজাতিগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পাখিদের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ, ঔষধি উদ্ভিদ ও জলজ উদ্ভিদের সমারোহ ক্যাম্পাসটিকে পাখিদের আহার ও বসবাসের উপযোগী করে তুলেছে। ক্যাম্পাসের বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ ও প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তফা ফিরোজ বলেন, ‘অতিথি পাখি আমাদের অনাবিল আনন্দ দেয়া ছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাদের যত্ন নেয়া আমাদের দায়িত্ব।’

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *