আজব খবর

জাবিতে কমছে শিয়ালের সংখ্যা!

মো. শরীফুল ইসলাম নকিব
জাবি: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এই ক্যাম্পাসের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে লেক ও ঝোপ-জঙ্গল। এই ঝোপ ও জঙ্গলে রয়েছে অসংখ্য বন্যপ্রানী। এদের মধ্যে অন্যতম হল শিয়াল। এক সময় আবাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতের বেলায় শোনা যেত শিয়ালের ডাক। সন্ধায় ক্যাম্পাসের সড়কগুলোতে চলতে শিয়াল দেখা যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবেশও পরিবর্তন হয়ে গেছে। ঝোপ-জঙ্গল নিধনের ফলে এখন আর তেমন শিয়াল দেখা যায় না। খুব বেশি শোনা যায় না শিয়ালে ডাকাও।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ক্যাম্পাসে যে পরিমান শিয়াল রয়েছে সেগুলো রক্ষা করা গেলেও আগামীতে প্রজননের মাধ্যেমে শিয়ালের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই জন্য ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে দুই ধরণের শিয়াল পাওয়া যায়। একটি পাতি শিয়াল অপরটি খেঁক শিয়াল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিয়াল পাওয়া যায় তা হল পাতি শিয়াল বা Asiatic Golden Jackal এর বৈজ্ঞানিক নাম Canis aureus বাংলাদেশের প্রায় সবস্থানে পাতি শিয়াল দেখা যায় তবে গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিলেটের বনগুলোতে এদের সংখ্যা বেশি।

পাতি শিয়াল সাধারণত বনের ভিতরে গর্ত করে বসবাস করে। মাঝে মাঝে খাবারের সন্ধানে বাহিরে আসে আবার গর্তে ফিরে যায়। পাতি শিয়ালের প্রধান খাবার হল ইঁদুর। ইঁদুর, খেয়ে কৃষিতে যেমন উপকার করছে তেমনি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের ময়লা-আবর্জনা ও মরদেহ খেয়ে থাকে। শিয়ালের চামরা, মাংস ও চর্বি ইত্যাদি দিয়ে লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে শিয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা শিয়ালের অস্তিত্ব রক্ষায় এই বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জানুয়ারির শেষের দিক ও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক পাতি শিয়ালের প্রজনন কাল। গর্ভকালীন সময় ৫৮ থেকে ৬৫ দিন। মাটির গর্তে বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চার সংখ্যা ৩ থেকে ৮ টি পর্যন্ত হতে পারে। দুধের পাশাপাশি মা তার বাচ্চার জন্য মুখে করে শিকার নিয়ে আসে আবার আধা হজম খাবার বমি করে বাচ্চাকে খেতে দেয়। ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বাচ্চা দুধ পান করে। দুধ ছাড়ার পর বাচ্চারা নিজ জীবন শুরু করে। পুরুষ পাতি শিয়াল ১০ মাস বয়সে এবং স্ত্রী পাতি শিয়াল ১৮ মাস বয়সে জনন প্রাপ্ত হয়। পাতি শিয়াল প্রায় ১২ বছর বাঁচে।

পাতি শিয়াল দেখতে অনেকটা হলদে লাল সাথে কালচে ভাব। নাকের অগ্রভাগ কালো। শিয়ালের দৈর্ঘ্য মাপ ১০০ সেন্টিমিটার। দাঁড়ান অবস্থায় উচ্চতা ৩৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৮ থেকে ১১ কেজি। পাতি শিয়াল বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিয়ালের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু বাংলাদেশে কমছে। সে সাথে কমছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর্বানাইজেশনের ফলে শিয়ালের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এছাড়া জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন জঙ্গল নিধনসহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি বন্যপ্রাণির জন্য খুব বেশি ক্ষতিকর। শীতকালে লতাপাতা ও বন জঙ্গল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে শিয়ালসহ বন্যপ্রাণি লুকানোর জায়গা পায় না। তারপরও যেগুলো আছে সেগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল তারা যাবে কোথায়?
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রশাসনকে বরাবর অবহিত করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকরী কোন প্রদক্ষেপ পাওয়া যায় না। ক্যাম্পাসের যেমন উন্নয়নের প্রয়োজন আছে তেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষারও প্রয়োজন আছে। ‘আমার চারপাশ যদি ভাল না থাকে তাহলে আমি ভাল থাকব না’ এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে।
ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। ক্যাম্পাসের বন জঙ্গল পরিস্কার ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে, পরিসংখ্যান ভবনের পিছনে, রসায়ন ভবনের দক্ষিন পাশে ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনের বন জঙ্গল ধ্বংস করার কারণে শিয়ালসহ অন্যান্য বন্যপ্রানীদের আবাস স্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ভাবে বর্জ ব্যবস্থাপনার কারণে এসব বন্যপ্রানীদের খাবারের সংকট দেখা দিচ্ছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *