সারা বাংলা

জাবিতে সেশনজট বাড়ছেই!

মো. শরীফুল ইসলাম নকিব
জাবি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিগত ছয় বছর কয়েক দফা আন্দোলনে শিক্ষা-গবেষণা বার বার ব্যাহত হয়েছে। দুই ভিসি বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ক্লাস বর্জন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এর ফলে প্রায় প্রতিটি বিভাগে ন্যূনতম ৪ মাস থেকে দেড় বছরের তীব্র সেশনজট তৈরি হয়েছে। সেশনজট কমাতে সে সময় শিক্ষক সমিতির নেতারা একাধিকবার ‘ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে’, প্রয়োজনে ‘ছুটির দিনেও ক্লাস নেয়া হবে’ সহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সকল ‘প্রতিশ্রুতি’ রক্ষা না করার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কোর্সে অচলাবস্থা বিরাজ করলেও চলমান নয়টি বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্সে (প্রাইভেট মাস্টার্স কোর্স) নেই কোন সেশনজট। এসব কোর্স নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে সাপ্তাহে ১ দিনের পরবর্তে ২দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নিয়মিত শিক্ষার্থীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কলা ও মানবিকী অনুষদের মধ্যে বাংলা বিভাগ ব্যতিত অন্যান্য বিভাগে কমপক্ষে ৫ মাস থেকে ১১ মাসের সেশনজট রয়েছে। সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে বিভিন্ন বিভাগে রয়েছে ৫-৮ মাসের সেশনজট। জীববিজ্ঞান অনুষদ, গণিত ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদের প্রতিটি বিভাগে রয়েছে ৪ থেকে ৯ মাসের সেশনজট। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ৪টি বিভাগেই রয়েছে ১ বছরের সেশনজট। সেশনজটের বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের ৪১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. সুমন জানান, ‘২০১৫ সালে বিবিএ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এমবিএ শেষ হয়নি। ১ বছরের কোর্স শেষ হচ্ছে না ২ বছরেও।’

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ১৪ বিভাগের ১৯টি ব্যচের পরীক্ষা স্থগিত হয়। যা সেশনজটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর আগে ২০১২ সালে ৯ জানুয়ারি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের হত্যাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সাথে ‘শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে ভিসি বিরোধী আন্দোলনে নামে শিক্ষকরা। এর পর থেকেই সেশনজট তীব্র হতে থাকে। ১৭ মে ভিসি শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করে। সে বছর ২০ মে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে আবারও বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে নামে ‘জাবি শিক্ষক সমিতি’। সে সময় টানা তিন মাস ক্লাস বর্জন করেন শিক্ষকরা। শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদারসহ অন্যান্য শিক্ষক নেতারা ‘এই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে’ বলে আশ্বস্ত করেন উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীদের। প্রয়োজনে ‘ছুটির দিনেও ক্লাস নেয়া হবে’ বলে জানান তারা। দীর্ঘ আন্দোলনে ফলে ২০১৪ সালে ১৩ জানুয়ারি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন পদত্যাগ করেন। প্রতিটি বিভাগে ১০ মাস থেকে এক বছরেও বেশি সেশনজট তৈরি হয়। ২০১৪ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামাতের হরতাল-আবরোধ ওই সেশনজটকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে শান্ত আছে বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেশনজট না কমার পিছনে শিক্ষকদের সেই ‘ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া’র প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করাকেই দায়ি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সপ্তাহে ২ দিন ছুটি ঘোষণার সময় শিক্ষকরা প্রতিশ্রুতি দেন- কর্মঘণ্টা বড়িয়ে সকাল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ক্লাস নেবেন, শিক্ষক বাস দুপুর ২টায় পরিবর্তে ৪ টায় ছাড়বে, গবেষণায় ব্যস্ত হবে শিক্ষকরা। কিন্তু ওই সকল প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত কোন বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষক বাস সেই পূর্ব নির্ধারিত সময়েই চলছে। দুপুর এক টার পর অধিকাংশ বিভাগে শিক্ষকদের পাওয়া যায় না। রুটিন মেনে ক্লাস না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইদুর হক নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ওই আন্দোলনে শিক্ষকদের স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু সেশনজটে ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন থেকে ১ বছর করে চলে গেছে। অনেক দরিদ্র বাবা-মার কষ্টে উপার্জিত লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করার কথা। কিন্তু প্রায় কোন বিভাগ এই নিয়ম মেনে চলে না। ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত লেগে যায় ফলাফল ঘোষণা করতে। এর ফলে শিক্ষার্থী অনেক চাকুরীতে আবেদন পারছেন না। এই বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. অসিত বরণ পাল বলেন- শিক্ষকরা নির্ধারিত সময় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ণ করে জমা না দেয়ায় ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয়।’

শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক অজিৎ কুমার মজুমদার জানান, ‘আমার সময় যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তবে সব শিক্ষক আন্তরিক না হলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না।’

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *