রাজনীতি লিড নিউজ

রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্বাভাবিক হারে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদেও নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় যেখানে গড়ে ৮-১০টি প্রকল্পের অনুমোদন হতো, সেখানে সরকারের শেষ সময়ে এসে তা বেড়ে এখন দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো প্রকল্পগুলোর মধ্যে অনেক প্রকল্প এখন পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাছাড়া কোনো কোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হয়নি। নেয়া হয়নি পরিবেশের সম্মতি। বেশ কিছু প্রকল্প আছে, যেগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি বলে নতুন করে আবারো ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার ঘোষণার আগে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো অর্ধশতাধিক প্রকল্প। অর্থনীতিবিদ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান সরকারের শেষসময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল ও সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক নির্মাণের মতো প্রকল্প। যদিও অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া ওসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ভোটারদের মন জয় করতে শেষ সময়ে এসে প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ওসব প্রকল্পে সামান্য টাকা বরাদ্দ দিয়ে ক্ষমতাসীনদের ভোটারদের আকর্ষণের চেষ্টা থাকবে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া ওসব প্রকল্পে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দেয়া সম্ভব হবে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকবে প্রকল্পের কাজ। তাতে একদিকে যেমন বাড়বে প্রকল্পের খরচ, অন্যদিকে বাড়বে প্রকল্পের মেয়াদও। ফলে সাধারণ মানুষ ওসব প্রকল্প থেকে কবে নাগাদ সুফল পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ওই বছরের ১৩ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭৮টি একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওসব সভায় ২ হাজার ২০৭টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় ২২ লাখ ৬৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। তার বাইরে পরিকল্পনামন্ত্রী নিজস্ব ক্ষমতাবলে গত পৌনে ৫ বছরে ৫৮৫টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। ওসব প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে ১৭ হাজার ৩১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ১৩ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে মোট ২ হাজার ৭৯২টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। ওসব প্রকল্পের প্রাক্কলিত খরচ ২২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত কোনো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে এলে ওই প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা পরিকল্পনামন্ত্রীর রয়েছে। ৫০ কোটি টাকার নিচে কোনো প্রকল্প একনেক সভায় ওঠাতে হয় না। একনেক সভায় পরিকল্পনামন্ত্রীকে শুধু অবগত করতে হয়। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ২২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হলেও এডিপির আকার এখনো ২ লাখ কোটি টাকার নিচে।

সূত্র আরো জানায়, যে কোনো সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা বেড়ে যায়। মূলত ওসব প্রকল্প নেয়ার উদ্দেশ্য থাকে ভোটারদের কাছে টানা। অথচ ওসব প্রকল্পে বেশি টাকা বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয় না। শুধু দেখানোর জন্য নেয়া হয়। ফলে প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ হয় না। বর্তমানে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে নেয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প। দেশের ৩৪ জেলার ১৮০টি উপজেলায় গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। তাছাড়া রুরাল কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট শিরোনামের প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ২১০ কিলোমিটার উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সড়ক ও ৫০০ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক নির্মাণের কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া একটি প্রকল্পও। ওই প্রকল্পের আওতায় ৩০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের শেষসময়ে এসে নতুন নতুন প্রকল্প না নিয়ে বরং পুরনো প্রকল্পগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। তাতে আর্থিক অপচয় কিছুটা হলেও কমবে। কারণ সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এতো বিশাল বাজেট তৈরি করা সম্ভব হবে না। সরকারের শেষ সময়ে কাজ করতে গিয়ে প্রকল্পের গুণগত মানও ঠিক রাখা যায় না।

অন্যদিকে সরকারের শেষ সময়ে এসে কেন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ছে তা ঠিক নয়। প্রকল্পের অনুমোদন চলে সুতার মতো। লম্বা লাইনে। আঁকাবাঁকা নেই। কখনো কম আবার কখনো বেশি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে না।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *