খেলা বিশেষ প্রতিবেদন

বিজয়ী মেয়েদের অভিনন্দন

ইকরামউজ্জমান
রাষ্ট্রীয় জীবনে সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে দেশের বৃহত্তর সমাজের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় নারী প্রতিনিধিদের উজ্জ্বল উপস্থিতি, তাঁদের আত্মবিশ্বাস, নিজ নিজ ক্ষেত্রে সামর্থ্যরে প্রয়োগ, কমিটমেন্ট ও দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতিকে বিমোহিত করে। আমরা লক্ষ করছি নারীসমাজের প্রতিনিধিরা কখনো তাঁদের নিজেদের অবস্থানে হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন। তাঁরা মেধা, যোগ্যতা ও সাহসের মাধ্যমে দেশকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিয়ে চলার লড়াইয়ে লড়ে চলেছেন, অনেকের কাছে হয়তো এটা চ্যালেঞ্জ। নারীরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা পরিবর্তনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছেন।

স্বাধীনতা দেশের পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অনাবিষ্কৃত শক্তিকে অবমুক্ত করে দিয়েছে, যা দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন ও ক্রীড়াঙ্গনে উল্লেখযোগ্যভাবে দেশকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। প্রথমে ব্রিটিশের প্রায় ২০০ বছর শাসন এবং এরপর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাঙালিদের রুদ্ধ করে রেখেছিল। পাকিস্তান থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি আমাদের জাতিসত্তা। এখন বোঝা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার কত প্রয়োজন ছিল।

ক্রীড়াঙ্গনে বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন নারী ফুটবলারদের জয়জয়কার। নারী ফুটবলাররা দেশের ফুটবলে এখন শক্তি। তাঁরা বাংলাদেশের ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছেন। ‘চেঞ্জিং দ্য গেম’-এর পতাকা বহন করে চলেছেন। ভবিষ্যৎ তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকে। নারী খেলোয়াড়রা স্বপ্ন দেখেন এবং স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করছেন মাঠে সেরাটা প্রয়োগের মাধ্যমে। বাড়ছে আন্তর্জাতিক চত্বরে দেশের ভাবমূর্তি। দেশবাসীর মুখে ফুটছে হাসি। থমকে যাওয়া, ভেঙে পড়ার নেতিবাচক মানসিকতা তাঁদের কাছে ভিড়তে পারছে না এবং মাঠে ধাক্কা খাওয়ার পর সেটা সংশোধন করে এগিয়ে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে লক্ষ্যে পৌঁছানো। দলগত উৎকর্ষ জয়ের ক্ষুধা, সাহস আর আত্মবিশ্বাস নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। চ্যালেঞ্জ নিতে নারী ফুটবলাররা ভয় পান না, বরং সম্মিলিতভাবে তাঁরা চান একটির পর একটি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে। ধারাবাহিকতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ জয় করাতেই খেলোয়াড়দের মাথার মুকুটে স্থান হয়েছে অনেক সোনালি পালক।

এক বছরের কম সময়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ছয়টি ফাইনাল খেলে পাঁচটিতে চ্যাম্পিয়ন ও একটিতে রানার্স-আপ, অসাধারণ অর্জন। নারী ফুটবলাররা আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন না, তাঁরা যেতে চান আরো অনেক দূরের মাঠে, সেখানে ওড়াতে চান প্রাণপ্রিয় লাল-সবুজের পতাকা।

যাঁরা ফুটবল অনুসরণ করেন তাঁরা নারীদের মাঠের ফুটবল দেখে মুগ্ধ। মেয়েরা ঘরে-বাইরে অনেক প্রতিকূলতার বিপক্ষে লড়ে ক্রীড়াঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক কিছু বিসর্জন দিয়ে কী কষ্টটাই না করছেন। মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করে অনুশীলন করছেন। মাঠে ফুটবলারদের পাসিং থেকে শুরু করে বল পজিশনিং, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেস চোখে পড়ার মতো। খেলতে তাঁরা ভয় পান না। প্রতিটি খেলায় লড়েন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। মানসিক শক্তিতে উজ্জীবিত হওয়ায় তাঁরা এগিয়ে যেতে পারছেন। লক্ষ্য ঠিক রেখে ধারাবাহিকতার সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রম যে সফলতা এনে দিতে পারে, আমাদের নারী ফুটবল দল তার প্রমাণ।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে আসা, শ্রেণিচরিত্রে ভীষণভাবে পিছিয়ে থাকা মেয়েরাই দেশের ফুটবলে আলো জ¦ালিয়েছেন। প্রথম বাতিঘর তো ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রাম। এরপর তো এই বাতিঘরের সন্ধান আরো অনেক মিলেছে।

নারী ফুটবলার মারিয়া সান্দা, সানজিদা, কৃষ্ণা রানী, মাসুরা, মৌসুমী, স্বপ্না, আঁখি আরো অনেক অনেক নাম দেশের ফুটবল রসিকদের মুখে মুখে ঠাঁই পাচ্ছে। তাঁরা তো শুধু নিজেরা জেতেননি, দেশকেও গৌরবান্বিত করেছেন। জাতিকে উপহার দিয়েছেন বিজয়। পুরো জাঁতি নারী ফুটবলারদের জন্য গর্বিত হয়েছে।

গত পরশু ৭ অক্টোবর ভুটানে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নেপালকে ১-০ গোলে পরাজিত করে আমাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এটা দেশের ফুটবলে অনেক বড় সাফল্য।

বিজয়ী স্কোয়াডের সবাইকে আমাদের অভিনন্দন। অভিনন্দন টিম ম্যানেজমেন্ট ও সব টেকনিক্যাল পারসনকে।
গত ১৮ আগস্ট এই মাঠেই সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফাইনালে ভারতের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ দল। সেই মাঠেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮-তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লড়াকু নারী দল। পুরো চ্যাম্পিয়নশিপে গোল করেছে ২৪টি। এইতো কিছুদিন আগেই ঢাকার মাঠে অনূর্ধ্ব-১৬ এএফসি কাপে দ্বিতীয় পর্বে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে নারী দল। আর কোনো দক্ষিণ এশিয়ার দেশ এটা পারেনি। আগেই উল্লেখ করেছি, একটির পর একটি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছেন বয়সভিত্তিক নারী ফুটবলাররা। তাঁদের আবার মাঠে নেমে পড়তে হবে, বিশ্রামের সুযোগ নেই। প্রস্তুতি নিতে হবে আরো বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চত্বরে লড়ার জন্য।

তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ নারী দল ২৪ অক্টোবর প্রথম ম্যাচ খেলবে শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলের সদস্যদের আগাম শুভেচ্ছা। নির্ভার ফুটবল খেলুন। অযথা চাপ নেবেন না। খেলায় হার-জিত আছেই।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *