বিশেষ প্রতিবেদন শিল্প সাহিত্য

বদলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের সুখের মোটিভ

বদলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের সুখের মোটিভ
-জয়া ফারহানা

আব্বাসউদ্দীনের সেই বিখ্যাত ভাওয়াইয়াটি মনে পড়ে। ‘ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’। মৎস্যলোভী এক বোকা বগার ‘ফাঁন্দে’ পড়ার কাহিনি নিয়ে লেখা গান। বহুবার শুনেছি। শুনে শুনে বোকা বগাটির প্রতি কখন যেন একটু মায়াও জন্মে গিয়েছিল অবচেতনে। মায়া বা করুণা যেটাই বলি এখন তা হয়েছে বুমেরাং। বুঝেছি প্রকৃত অর্থে আমাদের দশাও বোকা বগার মতোই। কিংবা তার চেয়েও করুণ। বগার ছিল সামান্য পুঁটি মাছের লোভ। সে কারণে ফাঁদটিও ছিল মাঝামাঝি ধরনের সরল। সামান্য লোভের সরল ফাঁদ। আমাদের লোভের অন্ত নেই, সীমা-পরিসীমা নেই। তাই ফাঁদটিও হয়েছে সেই রকম। মধ্যবিত্তের ফিলিস্টিসিজম (পেটি বুর্জোয়াবাদ) যেমন হয়। সামান্য একটা মোবাইলও আমাদের প্রতিদিন আপডেট করা চাই। প্রতিদিন মোবাইলের র‌্যাম ও রমের শক্তি বাড়াতে হয়। প্রতিদিন ক্যামেরার পিক্সেলের উন্নয়ন করতে হয়। প্রতিদিন নেটওয়ার্কের আপগ্রেডেশন দরকার হয়। প্রতিদিন অপারেটিং সিস্টেম হালনাগাদ করতে হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন অ্যাপস যুক্ত করতে হয়। শুধু বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন বলছে, প্রতিদিন এই নগরে যুক্ত হচ্ছে দুই হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি। ষাট ও সত্তরের দশকে পরিবারপ্রতি একটি সাইকেল হলেই চলে যেত। এখন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত গাড়ির অন্যায় ভোগাকাক্সক্ষা। অন্যান্য বিলাসিতার বিভ্রাট তো আছেই। মধ্যবিত্ত এখন আর অ্যাপার্টমেন্টে সন্তুষ্ট নয়, তার চাই সর্বশেষ মডেলের কন্ডোমিনিয়াম। উচ্চ-মধ্যবিত্তের উচ্চাকাক্সক্ষাও উচ্চাভিমুখী। ডুপ্লেক্স-ট্রিপ্লেক্স ভবনেও আর আটে না তার উচ্চাশা। তার আবার দরকার রিচমন্ড প্রাসাদ। ফলে আমরা পড়েছি বগার চেয়েও জটিল ফাঁদে। এই ফাঁদ ক্যাপিটালিজমের ফাঁদ। এর আরেক নাম পুঁজিতন্ত্রের ঘোরতর বিভ্রম।
মধ্যবিত্তের এই বিভ্রান্তি, চাহিদার মোটিফ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন মৃণাল সেন। তাঁর চলচ্চিত্রে মধ্যবিত্তের মূল্যবোধের অবনতি এসেছে নানা প্রতীকে। ‘আকালের সন্ধানে’ সিনেমায় মধ্যবিত্তের পতনকে তিনি দেখিয়েছেন ভেঙে পড়া বাড়ির প্রতীকে, খারিজ চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন বদ্ধঘরের প্রতীকে, ‘খ-হর’ সিনেমায় দেখিয়েছেন ধ্বংসস্তূপের মতো বাড়িতে ভাঙা দেয়ালের প্রতীকে। মধ্যবিত্তের ক্লীবত্ব দেখেছি খারিজ চলচ্চিত্রে পালানের মৃত্যুর দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অঞ্জন-মমতার দ্বৈতসত্তায়। ‘একদিন প্রতিদিন’ সিনেমায় মধ্যবিত্তের পোস্টমর্টেম দেখে মনে হয়েছে, এ আমাদেরই দেহের ব্যবচ্ছেদ। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো মধ্যবিত্ত সংবেদনশীল নয়, তা নয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের মূল প্রবণতা এখন একচক্ষু হরিণের মতো। সহযোগিতাপ্রবণ, সহমর্মী মধ্যবিত্তের ক্রোধ পরিণত হয়েছে আপসে। মধ্যবিত্ত চিরকালই তোষণপ্রবণ। তবে সে তোষণের আড়ালে অন্যায় অনিয়ম অবিচারের প্রতি তার যে ক্রোধ ক্ষোভ ঘৃণা ছিল তা আর নেই। আবুল হাসানের ভাষা ধার করে বলতে পারি, এখন চারপাশে কিছু মুখস্থ মধ্যবিত্ত দেখি। হতে পারে, সকাল-সন্ধ্যা বহুমাত্রিক টানাপড়েনের সঙ্গে লড়াই করে করে বাড়ি ফেরার পথে মধ্যবিত্তের লাশই ঘরে ফেরে, জীবন্ত মানুষটি নয়। হতে পারে সে কারণে প্রতিদিন একটু একটু করে মধ্যবিত্ত পরিণত হচ্ছে ব্যক্তিসর্বস্ব, স্বার্থসর্বস্ব, প্রযুক্তিসর্বস্ব এক জীবে। এ এক জটিল বিভ্রাট। মধ্যবিত্তের রিকন্ডিশন্ড গাড়িপ্রীতি এবং তার সূত্র ধরে যে বিলাসবিভ্রাট, পরিবেশদূষণের এও এক কারণ। পরিবেশদূষণের কারণে প্রতিবছর যে ৫২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে তার একটি অংশ মধ্যবিত্তের এই বিলাসবিভ্রাটের দায়। এই বিভ্রাটে পড়ে জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সব স্নিগ্ধতা।

দুই.
একুশ শতকের করপোরেট নাগরিক নস্টালজিক হতে চায় না। কারণ নস্টালজিয়া চলে যায় সেন্টিমেন্টালিজমের দিকে। কিন্তু আমরা করপোরেট নাগরিক নই। তাই নস্টালজিক হই। না হয়ে উপায়ও নেই। যা কিছু ভালো তার সবই দেখেছি শৈশবে। শৈশবে এমন প্রাণঘাতী আশ্বিন দেখিনি। বরং দেখেছি এই শেষ শরতে পাখির পাখায় কী অস্থির চাঞ্চল্য ভর করে, চমৎকার শিস দেয়, শুরু করে ঘর বাঁধার প্রস্তুতিপর্ব। আশ্বিনে যা তাদের চিরায়ত প্রেমস্পৃহা। দেখেছি কোনো বুনো গাছে ফুল ফুটলে, ফল পাকলে নানা রঙের পাখি কিভাবে ছেয়ে ফেলত গাছটি। ভোরে জানালায় মুখ বাড়ালে কালো মখমলের পাখার দু-একটা শিসও কি শুনিনি? শুনেছি, শুনেছি। দেখেছি, যেখানে জলের গভীরতা বেশি সেখানে কচুরিপানা জড়ো করে চারদিকে বাঁশ পুঁতে বড় বড় মাছ ধরা হয়। এই শরতেই দেখেছি পুকুরভর্তি পদ্ম পানিফল কলমিলতা টোপাপানা হেলেঞ্চা পাটিবেত শাপলা মাখনা বিষকাঁটা হীজজ বরকন উকল ও নানা প্রজাতির শৈবাল। দেখেছি জলাভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি নেমে আসতে। বাংলাদেশের আবহাওয়া আশ্বিনে তো চিরকালই নমনীয়। এ বছর অন্যান্য মাস তো বটেই, আশ্বিনও হয়ে উঠেছে অনমনীয়, অসহনীয়। তবে এ দোষ আশ্বিনের নয়। আশ্বিন এসেছিল তার চিরায়ত স্নিগ্ধ রূপেই। আশ্বিনের চেহারা বদলে দিয়েছে নাগরিক মানুষ। গাড়ির ধোঁয়া, নতুন নির্মিত ইমারতের ধুলা, প্লাস্টিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, সব মিলিয়ে নগরে নিটোল আশ্বিন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এই নগরে নির্জন খড়ের মাঠ নেই। তাই কিভাবে নির্জন খড়ের মাঠে এই শেষ আশ্বিনের রাতে কুয়াশা ফুল ছড়িয়ে যায়, তা দেখার সুযোগ নেই। অশ্বত্থগাছ নেই, তাই তার ডালে বসা কোনো পেঁচার ডাক শোনার প্রশ্নই নেই। শুধু কি ঢাকাতেই শরতের চেহারা ম্লান? ঢাকার বাইরের শহরগুলোতেও শরৎ হেমন্তের আমেজ পাওয়া কঠিন। ছোট শহরগুলোও আর স্নিগ্ধ শান্ত নেই। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামে নির্জন দুপুরে কান পাতলে আগে বাতাসে যে বিলাপের শব্দ শোনা যেত এখন তার পরিবর্তে শোনা যায় ভটভটি নছিমন করিমনের আওয়াজ।

তিন.
কিন্তু নাগরিক জীবনে টের পাই বা না পাই নাগরিক হট্টগোলের বাইরে প্রকৃতিতে শেষ শরৎ বা হেমন্ত শুরুর পরিবর্তনগুলো কিন্তু নীরবে ঘটছে। নগরে আশ্বিন টের পাওয়া যাক বা না যাক প্রকৃতির নিয়মে পরিযায়ী পাখিদের পরিযায়ী স্পৃহা একই রকম আছে। সেটা অবশ্য টের পাওয়ার উপায় নেই আমাদের। কিন্তু সুমেরুর নিদারুণ ঠা-া থেকে বাঁচতে ১১ হাজার মাইল দূর থেকে পাখিরা কিন্তু তাদের যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক মানুষ নাগরিক হয়েছে। পাখি প্রাকৃতিকই রয়ে গেছে। কার্তিকের অন্ধকারে সবুজ পাতার ক্রমেই হলুদ হয়ে আসার কথা লেখা আছে রূপসী বাংলায়। গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে দেখুন। সবুজ পাতারা হলুদ হয়ে আসছে।
আকাশে অস্থির মেঘদল নেই। মেঘহীন নিরবচ্ছিন্ন স্থির আকাশ। গভীর রাতে বৃষ্টিমুক্ত তরতাজা মোলায়েম বাতাস। ভোর ৫টার মিহি মিষ্টি রোদ এখনো হারিয়ে যায়নি। হুইটম্যানের ‘ষবধাবং ড়ভ মৎধংং’ কবিতার কথা মনে পড়ে। ‘ঞযরং রং হড় নড়ড়শ; যিড় ঃড়ঁপযবং ঃযরং, ঃড়ঁপযবং সরহফ’ অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন তার বক্ষে বেদনা অপার।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *