অর্থনীতি লিড নিউজ

উচ্চসুদের বিপুল সঞ্চয়পত্রে সরকারের ব্যয় বাড়ায় অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: উচ্চসুদেও বিপুল সঞ্চয়পত্রের কারণে সরকারের ঋণের ভার বাড়ছে। ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ঋণের ভার সরকার ৩-৪ গুণ বেশি বড় করে ফেলেছে। ইতিমধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ ৬ বছর আগে ওই বাবদ ঋণ ছিল মাত্র ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের কারণে ব্যাংকিং খাতে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য সংকট। ব্যাংকে টাকা না গিয়ে তা সঞ্চয়পত্রে চলে যাচ্ছে। পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। তাতে পুঁজিবাজারেও অস্থিরতা চলছে। আর ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদহার না কমার পেছনেও সঞ্চয়পত্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এমন ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ব্যাংকঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। মূলত জনগণকে সঞ্চয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করা, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, নারী, প্রবাসী বাংলাদেশী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার জন্যই সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার। যদিও বাংলাদেশে সরকারের ঘাটতি অর্থায়নের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে সঞ্চয়পত্র। বিগত ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৬৩ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে নিট ৪৭৯ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৭৭২ কোটি টাকার। তারপর থেকেই লাগামহীন গতিতে বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে ১১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। গত অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আরো ৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার। সব মিলিয়ে জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ১৭ ধরনের সঞ্চয়পত্র ও সরকারি বন্ড বিক্রি করে সরকার। সঞ্চয়পত্রে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পরিশোধ করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলো ৩ মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের সুদহারে বিশাল ঘাটতি মানুষকে ব্যাংকবিমুখ করে তুলছে। ফলে মানুষ ব্যাংক থেকে আমানত তুলে সঞ্চয়পত্র কিনছে। এমন পরিস্থিতিতে সুদহারের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সংখ্যা কমিয়ে তার বিক্রি সীমার মধ্যে রাখার কথা বলছেন ব্যাংকাররা। কারণ ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব না হলে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য হোঁচট খাবে। ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব না হলে দেশের প্রবৃদ্ধিতেও ধাক্কা লাগবে। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ না বাড়িয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদ ব্যয় অনেক কমে আসতো।

সূত্র আরো জানায়, প্রতি বছর বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, তা অর্জিত না হওয়ার কারণে সরকারকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ওপর জোর দিতে হচ্ছে। বাজেটে রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও কয়েক বছর ধরেই তা আহরণে ব্যর্থ হয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংশোধনের পথে হাঁটতে হচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে সংশোধন করে ২৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হলেও অর্থবছর শেষে সে লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি সংস্থাটি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার মূল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাময়িক হিসাবে এনবিআরের রাজস্ব এসেছে ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সর্বশেষ অর্থবছর শুধু এনবিআরের ঘাটতি মূল লক্ষ্যমাত্রার ৪১ হাজার কোটি টাকা; এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব যোগ করে ঘাটতি হিসাব করলে যার পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। তার আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও মূল লক্ষ্য থেকে রাজস্ব কম এসেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে ২ লাখ ১০৩ কোটি টাকার মূল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম রাজস্ব পেয়েছে সংস্থাটি। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক মিলিয়ে ওই দুই মাসে ৩৫ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআর আহরণ করেছে ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। ফলে ওই দুই মাসে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। যদিও পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয় প্রায় ৩২ শতাংশ।

এদিকে সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতাকে দেশের অর্থনীতির জন্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ)। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ও সমস্যা নিয়ে প্রকাশিত চলতি বছরের জুন সংখ্যার প্রতিবেদনে সংস্থাটি ওই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। সংকট সমাধানে পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, পাকিস্তানে চলতি শতকের শুরুর দিকেও ৩০ ধরনের বেশি সঞ্চয়পত্র ছিল। উচ্চ রিটার্নের জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি সব পক্ষই সেখানে বিনিয়োগ করছিল। ২০০০ সালে দেশটির সরকার সঞ্চয়পত্র সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়। ওই সংস্কার সরকারের সুদব্যয় কমানো, আর্থিক বাজার সুশৃঙ্খল করা, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগপ্রবাহ বাড়ানোর মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সফল হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে সঞ্চয়পত্রের বাড়তি সুদহার অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি জানান, সঞ্চয়পত্রের সুদহার কিছুটা কমানো হলেও সরকারি বন্ড বা গ্যারান্টি হিসেবে যেকোনো ব্যাংকের এফডিআরের চেয়ে মানুষের কাছে বেশি লোভনীয় হবে। দেশে নির্ভরশীল মানুষের জন্য তেমন কোনো আর্থিক নিরাপত্তা উপকরণ নেই। ওই কারণে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনতে বাধ্য হচ্ছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা যখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়, তখন এর লক্ষ্য ব্যাহত হয়। সেটি মূলত প্রশাসনিক সমস্যা। সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। কারা সঞ্চয়পত্র কিনছে, তাদের পরিচয় উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলে মানুষ ব্যাংকমুখী হবে।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, ব্যাংকের আমানত সঞ্চয়পত্রে চলে গেছে। ওই কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ব্যাংকের কাছে আমানত না থাকায় বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। ঋণের প্রবৃদ্ধিতে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। গত কয়েক মাসে ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক পরিস্থিতিতে চলে গেছে। সরকারের নির্দেশনার কারণেই ব্যাংকগুলো ঋণ ও আমানতের সুদহার কমিয়ে এনেছে। আমানতের সুদহার কমার কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র কিনছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *