অর্থনীতি লিড নিউজ

সংঘবদ্ধ চক্র এটিএম বুথে ঢুকিয়ে দিচ্ছে জাল টাকা

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: এটিএম বুথ থেকে বেরোচ্ছে জাল টাকার নোট। মূলত ব্যাংকার, সিকিউরিটি এজেন্সির লোকসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে চক্রটি গড়ে উঠেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে জালিয়াত চক্রের সদস্য বাংলাদেশ ব্যাংকেও থাকতে পারে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছে- বুথে জাল টাকা সরবরাহ করার সঙ্গে আউটসোর্সিং এজেন্সির লোকেরা জড়িত থাকতে পারে। আবার অনেকের মতে, ব্যাংকাররা জড়িত না থাকলে বুথে জাল টাকা প্রবেশের সুযোগ নেই। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরবরাহকৃত টাকার বান্ডিলে জাল টাকা থাকার কথাও বলেছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বেসরকারি একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে গত মার্চে ৫০ হাজার টাকা তুলেছিলেন ফেনী শহরের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন। পরদিন সেখান থেকে ২০ হাজার টাকা অন্য একটি ব্যাংকে জমা দিতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকার একটি নোট জাল হিসেবে চিহ্নিত করে।

পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় গিয়ে এটিএম বুথ থেকে জাল টাকা বের হওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। বরং উল্টো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে ভৎর্সনা শুনতে হয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে তাকে অগত্যা ওই জাল নোট ছিঁড়ে ফেলতে হয়। জাল নোটের বাহকই অপরাধী- আইনের এমন বিধানের কারণে গ্রাহকরা জাল নোট-সংক্রান্ত অধিকাংশ ঘটনাই হয়রানির ভয়ে চেপে যাচ্ছে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অভিযোগ জানিয়ে সমাধান হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ জানিয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে গ্রাহকরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক সিকিউরিটি এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে এটিএম বুথে টাকা সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে দেশে অরনেট সিকিউরিটি সার্ভিস, জি-৪, সিকিউরেক্স, মানিপ্লান্ট নামের ৪টি নিরাপত্তা এজেন্সি এটিএম বুথে টাকা সরবরাহের কাজ করে। ওসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিজেদের প্রসেসিং সেন্টারে নিয়ে যায়।

সেখানে টাকার স্তর বিন্যাস ও এটিএম বুথে ঢোকানোর অযোগ্য নোট পৃথক করা হয়। তারপর ওই টাকা এটিএম বুথে নিয়ে যাওয়া হয়। ভল্ট থেকে টাকা এনে এটিএম বুথে ঢোকানো পর্যন্ত অনেক মানুষ জড়িত থাকে। সেক্ষেত্রে কোনো স্তরের যে কেউ অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকেও জাল টাকা সরবরাহের নজির আছে। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোর কিছু করার থাকে না। তবে বুথে জাল টাকা সরবরাহের পরিমাণ খুবই কম। যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে দিন দিন এ ধরনের অপরাধ হ্রাস পাচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, সরষের মধ্যে ভূত থাকলে জাল নোট প্রতিরোধ হবে না। ব্যাংক টাকার বান্ডিল যেখান থেকে সংগ্রহ করা হয়, সেখান থেকেই অনেক সময় জাল নোট ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এটিএম বুথে জাল নোট নিয়ন্ত্রণে টাকার বান্ডিল সরবরাহকারীদের আগে ঠিক হতে হবে।

এদিকে দেশে জাল টাকা তৈরি ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতই অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন সময়ে বিপুল অর্থের জাল নোট জব্দও করা হয়। গত ৩ বছরে প্রায় ৫ কোটি টাকার জাল নোট চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৯শটি জাল নোট ধরা পড়ে। জাল করা ওসব নোটের বেশির ভাগই ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার। তার সঙ্গে যুক্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে এসব জাল নোটের কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০টি মামলা হয়েছে। আর বর্তমানে সারাদেশে জাল নোট-সংক্রান্ত ৬ হাজার ৬০৬টি মামলা ঝুলে রয়েছে। তারমধ্যেও নতুন মামলা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই জাল নোট-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

এদিকে এটিএম বুথে জাল নোট প্রসঙ্গে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এটিএম বুথ থেকে জাল টাকা বের হওয়ার দুয়েকটি ঘটনা শোনা গেছে। সেক্ষেত্রে গ্রাহককে এটিএম বুথ থেকে টাকা বের হওয়ার পর তা যাচাই করে নিতে হবে। কোনো জাল নোট পেলে সঙ্গে সঙ্গে কল সেন্টারে অভিযোগ দিয়ে জানানো উচিত।

দেশের সব এটিএম বুথেই সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকে। জাল নোটটি ক্যামেরার সামনে ধরে অভিযোগ জানানো যায়। তাছাড়া বুথের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গার্ডকে সাক্ষী করে লিখিত অভিযোগ দেয়ারও সুযোগ রয়েছে। গ্রাহক ও ব্যাংকারদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের মাধ্যমে জাল নোট প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মুখপাত্র ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত এটিএম বুথসহ ব্যাংকিং চ্যানেলে জাল টাকা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে জাল নোট প্রস্তুতকারী ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতই ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। ব্যাংকিং চ্যানেলে জাল টাকা সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জাল নোট প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগ রয়েছে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ জানান, কোনো গ্রাহক এটিএম বুথসহ ব্যাংকিং চ্যানেলে জাল নোট পেলে সে বিষয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেস্ক রয়েছে। যদিও সেক্ষেত্রে অভিযোগ প্রাপ্তির সংখ্যা নেই বললেই চলে। এটিএম বুথে টাকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জাল টাকা বুথে ঢুকতে পারে। এ বিষয়ে গ্রাহকদের যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *