প্রীতিলতা

জাতির বাতিঘর ছিলেন রমা চৌধুরী

ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া
একাত্তরের সাহসিকা, জাতির বাতিঘর, সভ্যতার বাতিঘর, আলোর যাত্রী অনন্য, অনুপম এক বটবৃক্ষ।ঘুণে ধরা সমাজে, পঁচে যাওয়া সমাজে, লোভাতুর, রাক্ষুসে পরিমন্ডলে মেরুদণ্ড চির সোজা করা ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যে ও ইংরেজি সাহিত্যের ডাবল (এম, এ) করা মেধাবী, কীর্তিমান ছাত্রী রমা চৌধুরী।দেশের জন্য, মাটির জন্য, মেধা, মনন থেকে শুরু তার সবটুকুন উজাড় করে দিয়েছেন।

অধিকন্তু আমরা জানি, সর্বগ্রাসী মরিচিকা ধরেছে জাতির মননে। কেবল মননে নয় বিবেক, লেহাজ, সম্মাবোধেও। তাই এই সমাজের মরিচিকা তুলতে খালি পায়ে তপ্ত পিচঢালা রাস্তার উপর দিয়ে হেটে চলেছিলেন আলোকবর্তিকা,প্রেরণার প্রথমা জাতির বাতিঘর,বুনন পারসোনা খ্যাত রমা চৌধুরী। মিথ নহে, মাঠের কথা। দিনের মধ্যাহ্ন।

প্রকৃতিতে রোদ আর মেঘের লুকোচুরি। চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবিতে শিরিষ গাছের শীতল ছায়ার ফাঁক গলে আসা রোদের উত্তাপে তপ্ত পিচঢালা রাজপথ। উত্তপ্ত এই পথ উপেক্ষা করে আলো হাতে খালি পায়ে হেঁটে চলেছেন ৭৪ বছরের এক বৃদ্ধা। এযেন বিশ্বকবির সেই কবিতা; আলো হাতে চলিয়াছে আধারেরও যাত্রী।তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে আকা… না তিনি ছবি নন রক্তমাংসের মানুষ। হাতে তার বইয়ের ঝোলা। ঘুরে ঘুরে দর্শনার্থীতের কাছে নিজের বই বের করে দেখাচ্ছেন, পাঠকের ইচ্ছে হলে কিনতে বলছেন।

বইয়ের ফেরিওয়ালা এই বৃদ্ধার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা দেখছেন বটে তবে.. আবার কেউ কেউ থমকে যাচ্ছেন আর ভাবছেন, কতটা জীবনী শক্তি থাকলে এই বয়সে মেরুদণ্ড সোজা করে চলা যায় তারই রিহার্সেল দিচ্ছেন এই অশতীপর এই বৃদ্ধা। মধ্যযুগয়ি কবির কবিতা একটু ঘুরিয়ে বলতে হয়,,মনে তার নিত্য আসা যাওয়া, ঘাড়ে তার বইয়ের ঝাপি..

একাত্তরের বীরাঙ্গনা, সাহসিকা, মুক্তিযুদ্ধের ঝাপটায় ঘরবাড়ি হারিয়ে , নিজের দু’সন্তান হারানো বিপর্যস্ত জীবনসংগ্রামী। চট্রগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার চিরভাস্বর ‘একাত্তরের জননী’ রমা চৌধুরী। বীর জননী কাঁধে ফেরি করে, ফেরি করে বিক্রি করেন নিজের লিখা বই। অশতীপর এই বৃদ্ধা বীর যোদ্ধা লিখেছেন আঠারোটি বই।

সত্যিই খোঁজে নেয়ার সমাজে, চেয়ে নেয়ার সমাজে, ধার করার সমাজে, ধান্ধাবাজির সমাজে, পদপদবী চেয়ে নেয়ার সমাজে, রমা চৌধুরী ব্যতিক্রম। বরেণ্য এই দুই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরীরা ছিলেন বলেই পথ হারায়নি বাংলাদেশ। সেজন্যই তিনি বলতেন ধারও নেব না, দান ও নেব না সারাজীবন বই বিক্রি করে চলব।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *