বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

কোরবানী হোক দুর্নীতিমুক্ত উপার্জনে নিবেদিত

মোমিন মেহেদী
সারাদেশে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ আর দুর্নীতিবাজদের রাজত্ব তৈরি হয়েছে পশুরহাটকে কেন্দ্র করে। একদিকে কোরবানীর জন্য নির্মম মিশনে নেমেছে আমলা-এমপি-মন্ত্রীগণ। অন্যদিকে তৃণমূলের মানুষের ভোগান্তি তৈরি করছে ছাত্র-যুব-শ্রমিক- স্বেচ্ছাসেবক সহ বিভিন্ন ক্ষমতাসীন, সাবেক ক্ষমতাসীন ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিগণ। কেউ যেন কারো চেয়ে কম যায় না। সবাই মিলেমিশে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠানোর রাস্তা তৈরি করছে। ভাবটা যেন এমন- ‘দল যার যার, লুটপাট সবার।’ তবু বাঙালি ধর্মপ্রাণ নিবেদিত থাকায় অন্যায় আবদার মেনে নিয়েও পশু কিনছে, প্রস্তুতি নিচ্ছে পবিত্র কোরবানীর। পাশাপাশি অবশ্য সমাজকে দেখানোর জন্য বা খাওয়ার জন্যও কোরবানী দিতে চায়, তারাওঝাঁপিয়ে পড়েছে পশু কেনার জন্য। এরা দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ যা-ই করুক না কেন, এদের টার্গেট থাকে লোক দেখানোর জন্য কোরবানী দিতেই হবে, বড়টাই দিতে হবে, দামীটাই দিতে হবে।

অথচ, কোরআনে বলা হয়েছে- ‘প্রিয় প্রাণীকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানী করো।’ হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পদাঙ্ক অনুসরন করে কোরবানী না করে একটা শ্রেণি বেরিয়েছে কেবল নিজেরা খাবে, িেশ খাবে, ভালো খাবে এই প্রত্যয়ে। আর তারই ধারাবাকিতায় সারা দেশে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। স্বাদ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে সবাই চায় সবচেয়ে ভালোমানের পশুটি কোরবানি দিতে। সাধারণত কোরবানির হাটে ক্রেতাদের বেশি চাহিদা থাকে লাল রঙের গরুতে। তবে কালো, সাদা ও ধূসর রঙের গরুর চাহিদাও বেশ। কিন্তু আপনি যে গরুটি ক্রয় করছেন সেটি কোন জাতের তা জানার একটা কৌতূহল অনেকের থাকে। কোরবানির হাটে দেশীয় গরুর মধ্যে ব্রাহমা, শাহীওয়াল, রেড সিন্ধি, লোকাল ক্যাটেল, রেড চিটাগং, হোলস্টাইন ক্রস, মিরকাদিম, পাবনা ক্যাটলসহ বিভিন্ন জাত দেখা যায়। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের নানা জাতের কিছু সংখ্যক গরু তো রয়েছেই।

পাশাপাশি লোকাল বা স্থানীয় জাতের গরু দেশের প্রায় সব এলাকায় পাওয়া যায়। দেশে মোট স্থানীয় জাতের গরুর মধ্যে ৮০ শতাংশই এ জাতের। তুলনামূলকভাবে ছোট এ জাতের গরু পরিণত বয়সে গড়ে ১৫০-২৫০ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়। দাম সহনীয় পর্যায়ে। কোরবানিতে দামের কারণে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর পছন্দের শীর্ষে থাকে এ জাতের গরু। গোশতের মান অত্যন্ত চমৎকার। এ জাতের গরুতে অপেক্ষাকৃত বেশি চর্বি থাকে এবং গোশত সুস্বাদু। গায়ের রঙ লাল, ধূসর, সাদা, কালো বা এসব রঙের নানা মাত্রায় মিশ্রণ যে কোনোটিই হতে পারে। এ জাতের গরুর পশম ছোট ও চকচকে। লম্বা লেজ দেখতে অনেকটা চাবুকের মতো। যারা কোরবানী আল্লাহর রাস্তায় নয়, খাওয়ার উদ্যেশ্যে করে থাকেন, তাদের অধিকাংশই মোটাসোটা গরু কোরবানি দিতে পছন্দ করেন। তাদের জন্য ‘ব্রাহমা’ জাতের গরু উপযোগী। এটির মূল উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশে এসেছে ভারত থেকে। খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় এটি বেশি উৎপাদিত হয়। দেশীয় জাতের গরু দৈহিক ওজন প্রতিদিন ২০০-৩০০ গ্রাম বৃদ্ধি পেলেও ব্রাহমা জাতের গরুর ওজন বাড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ গ্রাম। এ জাতের গরু হালকা ধূসর, লাল ও কালো রংয়ের হয়। পরিণত বয়সে প্রতিটি গরুর ওজন গড়ে ৫০০-৭০০ কেজি হয়। বলা হচ্ছে যে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় বেশি পাওয়া যায় এক শ্রেণির গরু, যার চাহিদা ব্যাপক। এই গরু ঢাকা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও বগুড়াতে এ জাতের গরু আছে। এসব অঞ্চলে কোরবানির হাটে এ গরুর চাহিদা বেশ। এ জাতটিকে একেবারে দেশি বলা যায় না। মূলত হরিয়ানা ও শাহীওয়াল প্রজাতির ষাঁড়ের সঙ্গে বাছাই করা কিছু জাতের গাইয়ের প্রজনন ঘটানোর মাধ্যমে জাতটির উন্নয়ন করা হয়। পাবনা ক্যাটল মূলত দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। তবে এটি থেকে বেশ ভালো পরিমাণ মাংসও পাওয়া যায়। পরিণত বয়সে এ জাতের প্রতিটি গরুর গড় ওজন ২৫০-৪০০ কেজি। এটির গায়ের রঙ সাধারণত লাল, ধূসর বা মিশ্রবর্ণের হয়ে থাকে।

কোরবানিতে পুরান ঢাকাবাসীর পছন্দের শীর্ষে থাকে ‘মিরকাদিমের ধবল গাই’। শত বছর ধরে এ গরু জোগান দিচ্ছে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের খামারিরা। সাদা রঙের বিশেষ জাতের গরুগুলো লালনপালন করা হয় মূলত কোরবানির ঈদে চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখেই। মোটা, গায়ের রঙ ধবধবে সাদা, আর আকর্ষণীয় শিংগুলো খাড়া, চোখ কাজল কালো আর তুলতুলে শরীর। ভারতের উড়িষ্যার জঙ্গলি, নেপালের নেপালি, ভুটানের বুট্টি গরু কিনে মিরকাদিমে লালনপালন করে কোরবানি ঈদে বিক্রি করার জন্য। এ ধরনের গরুর বাহ্যিক অবয়ব খুব তেলতেলে ও গোলাকৃতির হয়। মাংস মোলায়েম ও সুস্বাদু। এ জাতের গরুতে প্রচুর চর্বি হয়। আর চর্বিযুক্ত গরুর গোশত পুরান ঢাকাবাসীর বড়ই পছন্দ। গায়ের রং লাল। খাটো পা। আকারে ছোট। ওজন তিন থেকে সর্বোচ্চ দশ মণ। চট্টগ্রাম অঞ্চলে উৎপত্তি ও বিস্তার লাভ করায় এটি ‘চাঁটগাইয়া গরু’ নামে পরিচিত। রেড চিটাগং ক্যাটল বা সুন্দরী গরুও বলা হয়। গরুর দেশি জাতগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের লাল গরু তুলনামূলক উন্নত। দুধ ও মাংস উৎপাদনের পাশাপাশি চাষাবাদের জন্য এ জাতের গরুর বেশ উপযোগিতা রয়েছে। এ ধরনের গরুর দুধ ও মাংস বেশ সুস্বাদু। চট্টগ্রাম তো বটেই, অন্য জেলার বাসিন্দাদের কাছেও এ গরুর বেশ চাহিদা রয়েছে। দাম হাতের নাগালে। তাই কোরবানির বাজারে এ জাতের গরুর চাহিদা থাকে বেশি। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শাহীওয়াল জেলায় এ জাতের গরুর আদিবাস। উৎপত্তি পাকিস্তানে হলেও বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক দেশে এ জাতটির বিস্তার রয়েছে।

ধীর ও শান্ত প্রকৃতির, ভারি দেহ, ত্বক পাতলা ও শিথি। পা ছোট, শিং ছোট ও পুর, এ জাতের গাভীর শিং নড়ে, মাথা চওড়া। লেজ বেশ লম্বা, প্রায় মাটি ছুঁয়ে যায়, লেজের গোড়ায় দর্শনীয় একগোছা কালো লোম থাকে। কোরবানির হাটে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এ জাতের গরু। পরিণত বয়সে এ জাতের প্রতিটি গরুর ওজন ৩৫০-৪৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। মাংস মোলায়েম ও সুস্বাদু। এ ধরনের গরু মূল উৎপত্তি করাচি ও হায়দরাবাদ। তবে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডে এটি পাওয়া যায়। এ জাতের গরু মাঝারি দৈর্ঘ্য ও দৃঢ় দেহ। শিং মোটা ও পাশাপাশি অবস্থিত। শিং এর শেষপ্রান্ত ভোঁতা। গায়ের রং গাঢ় বাদামি বর্ণের মাঝে গাঢ় লাল বা হলুদ বর্ণ দেখা যায়। পরিণত বয়সে প্রতিটি গরুর ওজন ৩৫০-৪৫০ কেজি। কোরবানির হাটে এ জাতের গরুর বেশ কদর রয়েছে। এমন গরুর কদর নিয়ে এগিয়ে আসছে কোরবানীর ঈদ। কোরবানির পশুতে ভরে উঠেছে রাজধানীর হাটগুলো। নির্ধারিত জায়গা ছাড়িয়ে আশপাশের খালি জায়গায়ও রাখা হয়েছে অনেক পশু। গত বছর যে গরু ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে, এবার সে গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৭০-৮০ হাজার টাকা। এক লাখের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে দেড় লাখ টাকা। ফলে অনেকে বাজার ঘুরেও গরু কিনতে পারছেন না। তবে বেপারিরা বলছেন, পশু পালনে খরচ বেশি হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ, পরিবহন ও রাস্তার খরচ মিলে পশুর দাম বেশি পড়েছে। তাছাড়া বিক্রি তেমনভাবে শুরু না হওয়ায় বাজার যাচাই করতে দাম একটু বেশিই চাওয়া হচ্ছে। অনেক স্থানে পুলিশ আবাসনের জন্য নির্ধারিত খালি জায়গা পশুতে ভরে উঠেছে। পাশে রায়েরবাজার কবরস্থানের জন্য অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসনে নির্ধারিত জায়গাও পশুর দখলে। এখন আশপাশ ও সড়কের পাশের খালি জায়গায়ও পশু বাধা হচ্ছে।

ট্রাকে ট্রাকে নতুন পশু ঢুকছে। এ হাটে শনিবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামের গরু ছিল সাড়ে চার লাখ টাকার। ঝিনাইদহের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. ছলিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাড়িতে পালা দুটো ষাঁড় নিয়ে এসেছি। একটি সাড়ে চার লাখ টাকা এবং আরেকটি চার লাখ টাকা বলছি। তবে দুটো গরু সাত লাখ টাকা হলে বিক্রি করে দেব। শনির আখড়া সংলগ্ন দনিয়া কলেজ মাঠে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় এক লাখ গরু উঠেছে। এ হাটেও স্বল্পপরিসরে বিক্রি শুরু হয়েছে। শ্যামপুর বালুর মাঠ পশুর হাটে প্রায় ৫০ হাজার কোরবানি পশু উঠেছে। এ হাটে ট্রলারে ট্রাকে করে পশু আসছে। গোলাপবাগ মাঠে ৫০ হাজার কোরবানির পশু উঠেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও হাট ইজারাদাররা। মিরপুর-১২ নম্বর হাট আয়তনে খুবই ছোট। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গরু উঠেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তরা দিয়াবাড়ী হাটে অন্তত ২ লাখ কোরবানির পশু উঠেছে। আর খিলক্ষেত বনরূপা হাটে গরু উঠেছে লক্ষাধিক। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, মনের পশুরে করো জবাই।
আজ যেন কেউ আর মনের পশুকে কোরবানী করছে না।

বরং মনের পশুবৃত্তকে জাগিয়ে তুলে দুনীতি-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজী করে কে কত বড় পশু এনে কোরবানী দিয়ে তার মাংশ খাবে, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আর সেই প্রতিযোগিতাকে কোরবানীর সময় যত বড় পশুহবে, তত বেশি টাকা পাওয়া যাবে, এই ভেবে উসকে দিচ্ছেন আমাদের তথাকথিত আলেমগণ। যাদের টার্গেটও পশুর মাংশ খাওয়া, হালাল বা হারাম তা ভাববার সময় নেই। এমন একটা পরিস্থিতিতে এগিয়েচলছে বাংলাদেশ। ভালো কথা বলার জন্য মসজিদের ইমামগণও প্রস্তুত নন, পাছে চাকরিটা চলে যায় যদি। মাদক ব্যবসায়ী, সুদের কারবারী আর ধর্ষক-খুনীরা যখন মসজিদের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হয়, তখন আসলে বুঝেই নিতে হবে যে, ধর্ম কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু বলবো- আল্লাহ একজন আছেন, তিনি যেখাবে চাইবেন, সেভাবেই ইনশাল্লাহ পরিবর্তন আসবে, হাসবেই বাংলাদেশ, হাসবেই প্রকৃত ধর্মবোদ্ধাগণ। যাদের কাছে নামজ হালাল উপার্জনের পর সততার রাস্তায় অগ্রসর হওয়ার কারণেই ফরজ…

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *