রাজনীতি

রাজনৈতিক ইচ্ছাপূরণের অপচেষ্টায় সরকার: বিএনপি

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে সরকার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে প্রভাবিত করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। সোমবার সকালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সরকার গোটা বিষয়টাকে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে বলেই দলীয় একজন নেতাকে (আবদুল কাহ্হার আখন্দ) তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে মামলার অন্যতম আসামিকে (মুফতি হান্নান) দিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে। সেই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে হান্নান সরকারের ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিয়েছে। এখন তারা (সরকার) বিচার বিভাগকে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ইচ্ছাপূরণের অপচেষ্টায় রত হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং জাতীয় রাজনীতিতে এর বিষময় পরিণতি সম্পর্কে পুনরায় ভাবার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছি। কোনো মামলার রায় এখন দেশের বিচার বিভাগ নয়, আইনমন্ত্রী স্থির করেন।

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, কোন মামলার রায় কবে হবে, তা এখন আর বিচারকরা নয়, দেশের আইনমন্ত্রী স্থির করেন। বিচার বিভাগের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকলে এটা তিনি করতে পারেন, এটা সহজেই বোধগম্য। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিন দিন পর ২৪ আগস্ট আইভি রহমান মারা যান।

এ হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। আহত হয় অন্তত ৫০০ জন। সম্প্রতি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, আগামি সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের রায় দেওয়া সম্ভব হবে। রায়টি হলে দেশ আরো একটি দায় থেকে মুক্তি পাবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি ৫২ জন।

এর মধ্যে ১৮ জন পলাতক। এ মামলায় আদালতে ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ৫২ আসামির মধ্যে তিনজনের অন্য মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাঁদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তিন আসামি হলেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল। এখন ৪৯ আসামির বিচার চলছে।

এর মধ্যে এখনো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জন পলাতক। বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, সাবেক তিন আইজিপি ও পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন নেতা আবদুল মাজেদ বাটসহ ২৩ আসামি কারাগারে এবং আটজন জামিনে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ষড়ন্ত্রকারী হিসেবে আরো অনেকের নাম আসে। মামলায় মোট আসামি হয় ৪৯ জন। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল অভিযোগ করে বলেন, এই মামলায় তারেক রহমানের (বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) সম্পৃক্ততা না থাকলেও দলীয় লোক আবদুল কাহার আকন্দকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে তাঁকে জড়ানো হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হতে পারে, যার মধ্য দিয়ে জাতির আরেকটি কলঙ্ক মোচন হবে আইনমন্ত্রীর এ মন্তব্য করার পরপরই রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে কথা-পাল্টাকথা চলছে।

এরই মধ্যে গত শুক্রবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী ও মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানের ১৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামী মাসে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হলে বিএনপি আবারও রাজনৈতিক সংকটে পড়বে।

পরদিন শনিবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেনবিশিষ্ট সড়ক ট্যানেল নির্মাণকাজ পরিদর্শনে শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, এই ঘটনাটির নীলনকশাকারী বিএনপি। সে অবস্থায় আমরা বলতেই পারি, বিএনপির এর দায় এড়াতে পারে না। আমরা আশা করব, রায় বাস্তবতার নিরিখেই হবে। যা ঘটেছে সেই নিরিখেই বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে এই রায় দেবে। এবং সে জন্যই আমি বলেছি, বিএনপির অনেক নেতার জড়িত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

মামলার রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যের জবাবে বিএনপির মহাসচিব বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী মামলার রায় হওয়ার আগেই কী করে বলতে পারেন, এই মামলার রায় হওয়ার পর বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। এর অর্থ হলো, তিনি জানেন যে কী রায় হতে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বলা এসব বক্তব্যকে কোনো বিচারেই গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের পক্ষে বলা যাবে না। একমাত্র স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এমন ঘটনা সম্ভব। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে নতুন সংকট সৃষ্টির পরিবর্তে বিদ্যমান সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানেরও আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল বলেন, ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলা এবং তার ফলে মিসেস আইভি রহমানসহ অনেক নারী পুরুষের জীবন নাশ ও আহত হওয়ার নৃশংস ঘটনার আমরা তখনও নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং এখনো জানাই। আমরা এই ঘটনার জন্য দায়ী প্রকৃত অপরাধীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। কারণ আমরাও চাই, এমন নির্মম অরাজনৈতিক ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়। কিন্তু ওই ঘটনাকে পূঁজি করে সরকার ও সরকারি দল যেভাবে বিএনপি ও বিএনপির মূল নেতাদের অন্যায়ভাবে বিপদাপন্ন করার জন্য তাদের পুলিশ, গোয়েন্দা, তদন্ত কর্মকর্তা এমনকি বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নগ্ন প্রয়াস চালাচ্ছে তা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার মামলার পরপরই তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আইনগত পদক্ষেপ, সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেফতার এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলার গতি পরিবর্তনের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।

বিএনপি সরকারের আমলে ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তে ইন্টারপোল, এফবিআইকে দেশে নিয়ে আসা, মুফতি হান্নানসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেফতার, সিআইডি, ডিবিসহ পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা, হাই কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করাসহ নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে চার দলীয় জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেন, এসব কিছু প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধীদের শনাক্ত করার বিষয়ে তৎকালীন বিএনপির সরকারের আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার অভাব ছিল না। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নাল আবেদীন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মইনুল ইসলাম খান শান্ত, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আইন বিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া, কায়সার কামাল, সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন মেজবাহ উপস্থিত ছিলেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *