লিড নিউজ সারা বাংলা

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার নীতিমালার গেজেট প্রকাশের নির্দেশ

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও সহায়তাকারীর সুরক্ষায় প্রণীত নীতিমালার দুটি অংশে আদালতের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের হাই কোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই রায় দেয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিবকে এ গেজেট প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছে, এ-সংক্রান্ত নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত এ নীতিমালাই আইন হিসেবে বিবেচিত হবে। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রাশনা ইমাম, আনিতা গাজী রহমান ও শারমিন আক্তার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী জিনাত হক।

রায়ের পর আইনজীবী রাশনা ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত জারি করা রুল ‘যথাযথ ঘোষণা করে’ রায় দিয়েছে হাই কোর্ট। একই সঙ্গে ২০১৮ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের করা এ-সংক্রান্ত নীতিমালার দুটি অংশে আদালতের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে নীমিালাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছে। দুই বছর আগে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছিল হাই কোর্ট। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং চিকিৎসা না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কোথায় অভিযোগ করবে সে বিষয়ে নীতিমালা করতেও সরকারকে নির্দেশ দেয়।

রুলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও সৈয়দ সাইফুদ্দিন কামাল নামের এক ব্যক্তির জনস্বার্থে করা রিট আবেদনে ওই নির্দেশনা দিয়েছিল আদালত। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি আরাফাত নামের এক ব্যক্তি বাসে উঠতে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে নিকটস্থ তিনটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এরপর পুলিশের সহযোগিতায় তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। ওই ঘটনায় পরিপ্রেক্ষিতে করা রিট আবেদনটিতে বলা হয়, এ ধরনের দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিদিনই চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মারা যাচ্ছে সাধারণ নাগরিকরা। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা প্রয়োজন।

আদালত রুলের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারির পাশাপাশি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা ২০১৪-১৬ অনুযায়ী সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলে। এছাড়াও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান ও চিকিৎসা পেতে বাধা পেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কোথায় অভিযোগ করবেন সে বিষয়ে নীতিমালা তৈরি ও এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির নির্দেশ দেয়। সে অনুযায়ী যানবাহন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসাসেবার স্বার্থে সরকার ‘জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তাকারী সুরক্ষা প্রদান নীতিমালা-২০১৮’ প্রণয়ন করে। নীতিমালার ‘প্রযোজ্যতা’ অংশে বলা হয়েছে, দেশের সব সড়ক-মহাসড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এ নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি সেবা প্রদান’ অংশে বলা হয়েছে, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে (গোল্ডেন আওয়ার এর মধ্যে) তাকে নিকটতম হাসপাতালে প্রেরণ এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হবে। আইনি জটিলতার সম্ভাবনা বিবেচনায় চিকিৎসা সেবায় দেরি করা যাবে না এবং আহত ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতা বিষয় বিবেচনা না করে বেসরকারি হাসপাতালগুলো কর্পোরেট সোশাল রেসপন্সসেবিলিটির (সিএসআর) আওতায় চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে।

নীতিমালার ‘চিকিৎসা সেবা প্রদানে স্থানান্তর’ অংশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ (ইনটিগ্রেটেড) চিকিৎসা সেবা সুবিধা বা সক্ষমতা না থাকলে রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যাবলী লিপিবদ্ধ করে (গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে উন্নত জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে উপযুক্ত চিকিৎসা সুবিধা সম্বলিত হাসপাতালে নিজ দায়িত্বে স্থানান্তর করবে। ‘উপযুক্ত সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল কর্তৃক চিকিৎসা প্রদানের বাধ্যবাধকতা’ অংশে বলা হয়েছে, আহত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রদানে সক্ষমতা সম্পন্ন হাসপাতাল কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে ফেরৎ বা স্থানান্তর করতে পারবে না। ‘চিকিৎসাধীন ব্যক্তির সম্মতিগ্রহণ’ অংশে নীতিমালায় বলা হয়েছে, আহত ব্যক্তি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক ও সম্মতি দিতে সক্ষম হলে তার জীবন রক্ষার্থে শল্য চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তার সম্মতি নিতে হবে। আহত ব্যক্তি চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিভাবকের সম্মতি নিতে হবে। অভিভাবক না থাকলে বা না পাওয়া গেলে শল্য চিকিৎসা জরুরি হলে তার সম্মতি আছে বলে ধরে নিয়ে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। জরুরি শল্য চিকিৎসার কারণে আহত ব্যক্তির জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে বা জীবনহানি ঘটলে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

নীতিমালার ‘অবহেলা বা শৈথিল্য প্রদর্শন’ অংশে বলা হয়েছে, জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির অবহেলা বা শৈথিল্য অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে; অবহেলা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করলে নিবন্ধন বা লাইসেন্স বা অনুমতি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে বিধিমত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ‘জরুরি স্বাস্থ্য সেবা সেল গঠন’ অংশে বলা হয়েছে, সরকার এ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি জরুরি স্বাস্থ্য সেবা সেল গঠন করবে; এই সেল নীতিমালার কার‌্যকারিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে উপযুক্ত সুপারিশ প্রণয়ন ও মনিটরিং করবে এবং মনিটরিংয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদানের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা শৈথিল্য চিহ্নিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা বিচার্য হবে। ‘আহত ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহকরণ’ অংশে বলা হয়েছে, সব হাসপাতাল সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা সেবা প্রদান সংক্রান্ত তথ্য নির্ধারক ছক অনুযায়ী ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেরণ করবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে।

‘আহত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীর সুরক্ষা’ অংশে বলা হয়েছে, একজন সহায়তাকারী কোনো কর্মের জন্য দায়ী হবেন না। আহত বা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির সহায়তাকারীকে নাম, ঠিকানা বা টেলিফোন নম্বর প্রদানে বাধ্য করা যাবে না। তবে তিনি স্বেচ্ছায় তথ্য দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা লিপিদ্ধ করে সংরক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে পারবে। কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আহত ব্যক্তির আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো সহায়তাকারীকে চিকিৎসাব্যায় সংশ্লিষ্ট কোনোরূপ অর্থ পরিশোধে বাধ্য করতে পারবে না। কোনো সহায়তাকারীকে সাক্ষ্য প্রদানে বাধ্য করা যাবে না। এই অংশে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সহায়তাকারী সাক্ষী হতে ইচ্ছুক হন, তদন্ত কর্মকর্তা তার সুবিধাজনক সময় এবং স্থানে তাকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তার প্রতি লিঙ্গ, ধর্ম, জাতীয়তা, বর্ণ বা অন্য কোনোরূপ বৈষম্য প্রদর্শন বা হয়রানি করা যাবে না। ‘আহত ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা অন্য কোনো ব্যক্তির করণীয়’ অংশে নীতিমালায় বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে চিকিৎসা সেবা প্রদানের পূর্বে তাকে কোনোরূপ হয়রানি বা আইনহত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কোনো পুলিশ স্টেশনে পাঠানো কিংবা আনা যাবে না।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার আগে আহত ব্যক্তির চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পুলিশ কর্তকর্তা আহত ব্যক্তির জখমের প্রকৃতি এবং আঘাতের বিস্তারিত বিবরণ প্রদানের জন্য কোনো চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিকে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ করেতে পারবেন না। আহত ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা সম্বলিত হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপযুক্ত যানবাহনের ব্যবস্থা করবেন। অথবা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহায়তা গ্রহণ করবেন। নীতিমালার ‘জনসচেতনতা ও প্রচার’ অংশে আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নিয়মিত প্রচার ও বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ সেবা বিষয়ে মহড়া এবং আহত ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসা শিক্ষা কারিকুলাম যুক্ত করতে বলা হয়েছে সরকারকে।

‘সরকারের ক্ষমতা’ অংশে বলা হয়েছে, সরকার এই নীতিমালা কার্যকর করার ছয় মাসের মধ্যে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের অবকাঠামো, জনবল এবং যন্ত্রপাতির তালিকা নির্ধারণ করবে। এছাড়া এ নীতিমালা কার্যকরের লক্ষ্যে সরকার অবকাঠামোগত ও প্রয়োজনীয় সেবা সুবিধা নির্দিষ্ট করে ছয় মাসের মধ্যে ‘জাতীয় অ্যাম্বুল্যান্স কোড’ প্রণয়ন করতে হবে। অর্থাৎ, হাসপাতালের ‘জরুরি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে’ কয়টি করে অ্যাম্বুলেন্স থাকবে এবং রোগের ধরন অনুযায়ী সেসব অ্যাম্বুলেন্সে কী কী সুবিধা থাকবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *