লিড নিউজ সারা বাংলা

রাজধানীতে ফিরছে মানুষ, পথে বাড়ছে চাপ

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: ফাঁকা ঢাকা আবার পরিপূর্ণ হতে চলেছে। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে কর্মজীবী মানুষ। ঈদ আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের ছুটি শেষে প্রথম কর্মদিবস রোববার সকাল ঢাকার রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল আর সদরঘাট লঞ্চঘাটে দেখা গেছে ফিরতি পথের যাত্রীদের ভিড়।

দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লঞ্চের যাত্রীদের যাত্রা স্বস্তির হলেও বাসে রওনা হওয়া যাত্রীরা কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া ঘাটে জটে পড়ে ঢাকা পৌঁছাচ্ছেন কয়েক ঘণ্টা দেরিতে। রেলের সূচিতে গড়বড়ের কারণে ট্রেনের যাত্রীদেরও ভুগতে হচ্ছে। রোববার সকালে কমলাপুর স্টেশনে আসা সব কটি ট্রেনেই ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। আর উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্টেশন থেকে আসা ট্রেনের যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল ক্লান্তি আর বিরক্তির ছাপ।

ঈদের আগে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের অধিকাংশ ট্রেন কয়েক ঘণ্টা করে দেরিতে ছাড়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। ফেরার পথেও তাদের একই অভিজ্ঞতা হচ্ছে। রাজশাহীর ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা থাকলেও পৌঁছেছে তিন ঘণ্টা ৫০ মিনিট দেরি করে বেলা ৮টা ৪০ মিনিটে। খুলনার সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৫টা ৪০ মিনিটের বদলে স্টেশনে পৌঁছেছে সকাল সাড়ে ৮টায়। চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ১০ মিনিটে আসার কথা ছিল; প্রায় ছয় ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১টায় ট্রেনটি স্টেশনে আসে।

এই ট্রেনে ঢাকায় আসা সোহেল রানা বলেন, গত শনিবার রাত ৯টা ২০ মিনিটে নীলসাগর এক্সপ্রেসের চিলাহাটি ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেড়েছে রাত ২টায়। ছাড়ছে দেরিতে। আর পথেও বিভিন্ন স্টেশনে দেরি করছে। সকালে যখন নামার কথা তার ছয় ঘণ্টা পরে নামলাম। একই অবস্থা দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেসের। ট্রেনটি ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে, আর পৌঁছেলে একটা ২০ মিনিটে। একতায় ঢাকা ফেরা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, রাত ১১টায় ট্রেন ছাড়ার কথা, ছাড়তেই রাত সাড়ে ৩টা বাজিয়েছে। একে তো ট্রেন লেট তার ওপর প্রচ- ভিড়। বাচ্চাদের নিয়ে কি যে কষ্ট করতে হয়েছে তা বোঝানো যাবে না।

এই বিলম্বের কারণে এক দিকে রাতের ট্রেনের যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে, অন্যদিকে অনেকেই সময়মত ঢাকা পৌঁছাতে না পেরে ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে ঠিকমত অফিস ধরতে পারেননি। কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, যাত্রীদের ‘অতিরিক্ত চাপে’ ট্রেন আসতে দেরি হচ্ছে; বেলা ১১টা পর্যন্ত ১৮টি ট্রেন ঢাকা পৌঁছেছে। প্রতিটি স্টেশন থেকেই প্রচুর যাত্রী উঠছে। ফলে ট্রেন সময়মত ছাড়তে পারছে না। আবার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলো স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না।

এ কারণে ঢাকায় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। সারাদিনে মোট ৬৭টি ট্রেন ঢাকা আসার কথা রয়েছে। আর ঢাকা ছেড়ে যাবে ৬৬টি ট্রেন। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনে আসে এগারসিন্ধুর প্রভাতী ট্রেন। আধা ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছানো ট্রেনটি ছিল যাত্রীতে পূর্ণ। এই ট্রেনে কুলিয়ারচর থেকে আসা ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মো. ডালিম হোসেন জানান, দেরি যা হয়েছে, তার চেয়ে ভিড়ের মধ্যে ভোগান্তি হয়েছে অনেক বেশি। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে আসলাম। দুজনের জন্য দুটো টিকেট কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পেয়েছি একটা। ছেলেকে সিটে বসিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে এসেছি। এত ভিড়, অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। টিকেট না কাটা লোকজনের কারণে টিকেটওয়ালা যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এই ট্রেনে আসা আশরাফুল আলম। টিকেট না কিনে লোকজন কীভাবে ট্রেনে ওঠে বুঝি না। তারা টিকেটওয়ালা যাত্রীদের সিটে বসে পড়ে। ওঠাতে গেলে ঝামেলা করে। আজ অনেকের সঙ্গে এরকম ঝামেলা হয়েছে।

রাজধানীর জুরাইন এলাকার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস মেয়ের শ্বশুরবাড়ি নীলফামারী যাবেন। সকাল ৮টার নীলসাগর এক্সপ্রেস ধরতে মেয়ে আর নাতনীকে নিয়ে সকাল ৭টায় কমলাপুর এসেছিলেন তিনি। কিন্তু বেলা ১২টা পর্যন্ত সেই ট্রেন স্টেশনেই আসেনি। আবদুল কুদ্দুস বলেন, এক ঘণ্টা দেরি হলে সেটাও মানা যায়। তাই বলে আটটার ট্রেন ১২টার সময়ও আসবে না? রেলওয়ের লোকজন তো দেখি উন্নয়ন উন্নয়ন বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। কিন্তু ট্রেন সময়মতো ছাড়তে পারে না।

এদিকে, বিআইডব্লিউটিএ-এর পরিবহন পরিদর্শক (টিআই) এবিএস মাহমুদ বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা ৮১টি লঞ্চ সকালে ঢাকা সদরঘাটে ভিড়েছে। প্রতিটি লঞ্চেই ভিড় ছিল, তবে তা উপচে পড়া ভিড় বলা যাবে না। রোববার থেকে অফিস ধরার জন্য অনেকে গত শনিবারই ঢাকায় ফিরেছেন, আবার যারা বাড়তি ছুটি নিয়েছেন, তাদের অনেকে রোববার সন্ধ্যায় বা সোমবার সকালে ফিরবেন। এমভি আওলাদ লঞ্চের মহাব্যবস্থাপক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, পটুয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা তাদের আওলাদ-৭ রোববার ভোরে সদরঘাটে পৌঁছেছে। যাত্রী মোটামুটি ছিল। আশা করছি আগামীকাল আরও বেশি যাত্রী আসবে।

পটুয়াখালী থেকে আসা রাকির হাসান জানান, তিনি গুলশান পুলিশ প্লাজায় যে মোবাইল ফোনের দোকানে চাকরি করেন, সেটি খুলবে সোমবার। তবে ভিড়ের ভয়ে একদিন আগেই তিনি এসেছেন। চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসা হাসান ল্যাবএইড হাসপাতালের মিরপুর শাখায় কাজ করেন। রফরফ-৭ লঞ্চে চড়ে রোববার সকালে ঢাকায় পৌঁছে কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি। হাসান বলেন, কেবিনে, ডেকে যাত্রী ছিল। তবে যাওয়ার সময় যেমন চাপ থাকে, ফেরার সময় অত ছিল না। এমভি ফারহান লঞ্চের এক কর্মচারী বলেন, প্রতি বছর এমনই হয়। অফিস খুললেও পুরো সপ্তাহ ধরে যাত্রী আসতে থাকে। যাওয়ার সময় ঈদের দুইদিন আগে যাত্রীর যে চাপ সদরঘাটে দেখেন, ফেরার সময় ওইরকম দেখবেন না। ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান বলেন, যাত্রীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে আমরা নিরাপত্তার সব ব্যবস্থাই করেছি।

অন্যদিকে নাব্য সংকটে কারণে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন দক্ষিণ জনপদের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়া বাসযাত্রীরা।
বিআইডব্লিউটিসির এজিএম খন্দকার শাহ খালেদ নেওয়াজ জানান, ওই রুটে গত শনিবার রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ার পর গতকাল রোববার ভোরে আটটি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার শুরু হয়। কিন্তু ১০টি ফেরি বন্ধ থাকায় বেলা ১২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পদ্মার দুই তীরে আটকে আছ প্রায় সাড়ে চারশ যানবাহন। ঘাট কর্তৃপক্ষ চালকদের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার করার পরামর্শও দিলেও গাড়ির চাপে সেখানেও জট তৈরি হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ফেরিঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বলে দক্ষিণের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যাত্রীরা ঢাকা পৌঁছাচ্ছেন সম্ভাব্য সময়ের বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে। ঢাকার গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সদস্য মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, মাওয়া রুটে নাব্য সংকটের কারণে চাপ পড়েছে দৌলতদিয়ায়। গতকাল রাতে যে গাড়িগুলো দক্ষিণবঙ্গ থেকে ছেড়ে এসেছিল, সেগুলো সব এখনও গাবতলী পৌঁছাতে পারে নাই। গাবতলীর বিভিন্ন কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত শনিবার ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ ততটা না থাকলে রোববার সকালে বেশ ভিড় ছিল। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে আসা অধিকাংশ বাসের টিকে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল আগেই। আর এমনিতে যেসব বাস লোকাল হিসেবে চলে, সেগুলোও সিটিং হিসেবে ঢাকার পথে চলাচল করছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *