অর্থনীতি লিড নিউজ

জাল নোটের মামলা হলেও শাস্তি পাচ্ছে না অপরাধীরা

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: দেশে জালনোট চক্রের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হলেও তাতে কোনো শাস্তি হচ্ছে না। বরং আটক ব্যক্তিরা সহজেই জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকার কারবারিরা প্রতি বছর সক্রিয় হয়ে উঠে। বিশেষ করে কোরবানি পশুর হাট এবং বিভিন্ন কেনাকাটায় জাল টাকার ছড়াছড়ি বেশি হয়। তবে বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ তখন বেশি সচেতন থাকায় জাল নোটের কারবারিরাও ধরা পড়ে বেশি। তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তারা শাস্তির আওতায় আসে না। বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে ওসব মামলা। আর আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে অপরাধীরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে জালনোট সংক্রান্ত সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে চলতি বছর ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) নতুন মামলা হয়েছে ৮৫টি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২২টি। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে জালনোট সংক্রান্ত মামলা ছিল ৬ হাজার ১৯৫টি। ওই বছরে নতুন করে ৩৪৪টি নতুন মামলা হয়। নিষ্পত্তি হয় মাত্র ১০৬টি। ডিসেম্বর শেষে নিষ্পত্তি না হওয়া মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪৩৩টি। পরের বছর নতুন মামলা হয় ২৮৭টি। কিন্তু নিষ্পত্তি হয় মাত্র ১১৭টি। ফলে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৪৩টি। অধিকাংশ মামলার আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। আর চূড়ান্ত রায়ে পায় খালাস। কারণ হচ্ছে জাল টাকার মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায় না। যেখান থেকে জাল টাকা উদ্ধার করা হয় সেখানকার দারোয়ান, রিকশাচালক কিংবা ভাসমান কাউকে সাক্ষী করা হয়। তাছাড়া ভুল ঠিকানা ব্যবহারেরও প্রবণতা রয়েছে। নোট জালকারী চক্রের পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থাকে। ফলে কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশে ঘুষের বিনিময়ে বা হুমকির কারণে ভৌতিক সাক্ষী করে পুলিশ। ওসব সাক্ষীর অস্তিত্ব না পেলে আসামিরা সহজেই খালাস পেয়ে যায়। আবার কখনো কখনো অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে পুলিশ অভিযোগ শিথিল করে চার্জশিট দেয়। ওই চার্জশিট অনুসারে পরবর্তীতে মামলার বিচার শুরু হয়। তাতেও সহজেই মামলা থেকে রেহাই পায় জাল টাকা প্রস্তুত ও সরবরাহকারীরা। পরে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

সূত্র জানায়, প্রচলিত দুটি আইনে জালনোট সংক্রান্ত মামলার বিচার করা হচ্ছে। ওই আইন দুটির ফাঁক-ফোকর বের করে অধিকাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বিচার চলাকালে আসামিরা জামিনে থাকার ঘটনাও ঘটছে। বিচারিক ওই দীর্ঘসময়ে তারা আবার জালনোট বিস্তারে কাজ করে। দেখা যায় বিচারাধীন মামলার আসামিরাই বারবার আটক হচ্ছে। আইনের ওই দুর্বলতা দূর করতে নতুন আইন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ‘জালনোট নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ-আইন-২০১৭’ শীর্ষক খসড়া আইন চূড়ান্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জাল নোটের কারবারিরা সাধারণত বড় নোট বিশেষত এক হাজার ও ৫০০ টাকার নোট সবচেয়ে বেশি জাল করে থাকে। জালনোট সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সর্বমোট ২০ হাজার ৭৯০টি জাল নোট ধরতে পেরেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উদ্ধারকৃত নোটের মধ্যে এক হাজার টাকার জালনোটের সংখ্যা ১৫ হাজার ৭৮০টি। যা মোট ধরাপড়া নোটের ৭৬ শতাংশ। ওই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে ৫০০ টাকার নোট ধরা পড়েছে ৩ হাজার ৮৯৩টি। ১০০ টাকার নোট ধরা পড়েছে এক হাজার ১১৮টি। ৫০ টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে ৭২টি।

সূত্র আরো জানায়, জালনোটের ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর কোরবানির আগে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন সরবরাহসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি জালনোট প্রতিরোধে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পোস্টারিং করা, আসল নোট চেনার উপায় সংবলিত বিজ্ঞাপন সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারের ব্যবস্থা করা, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভিডিও প্রদর্শন করা, এটিএম মেশিনে টাকা ঢোকানোর আগে তা পরীক্ষা করাসহ নানান পরামর্শ দিয়ে থাকে। তাছাড়া ওই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তৎপরতা বাড়াতে যৌথ সভা করে থাকে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাল নোটের ব্যবহারও বেড়েছে। যার ফলে সাধারণ মানুষকে ওই ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এ কারণে জাল নোটের ব্যবহার বন্ধে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জালনোটের মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কারণ এ বিষয়ে বিচারকার্যে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। জালনোট কারবারিদের কঠোরভাবে দমন করতে নতুন আইন হচ্ছে। আইন হলে জালনোটের কারবারের সঙ্গে জড়িতদের সহজেই জামিন পাওয়া বন্ধ হবে এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে।

অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, জাল নোট তৈরি চক্রের সদস্যদের দিকে কঠোর নজরদারি রয়েছে। ইতোমধ্যে ওই চক্রের বড় সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দেয়া হচ্ছে। তবে আসামি জামিন পাওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞ আদালতই দেখেন। আর প্রতিবারের মতো এবারও জাল নোট শনাক্তের জন্য পশুর হাটে মেশিন থাকবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *