অর্থনীতি লিড নিউজ

ইয়াবার কারবারেই ওরা কোটিপতি!

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: মাত্র বছর পাঁচেক আগেও যাদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। এক বেলা খেলে দু’বেলা উপোস করতো, পরনে ভাল কাপড় ছিলো না, রোগের চিকিৎসাও হয়নি ঠিকমত। সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি কিংবা আভিজাত পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা করা যায়নি অর্থ সংকটে। আর এখন সময়ের ব্যবধানে তাদের সংসারে সুখ আর সুখ। বিলাসিতাতো আছেই। চাল-চলনে মনে হয় তারা খেতাবপ্রাপ্ত ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন। মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের পাশেই বসে খোশ গল্প করেন তারা। দামী বাড়ী-গাড়ীও ব্যবহার করছেন। সুযোগ পেলে দানবীরও সাজেন সামাজিক কর্মকান্ডে।

আসলে এ ধরনের ধনীরা ইয়াবার কারবার করেই নিজকে রাতারাতি পাল্টে ফেলেছেন। কে ভাববে তারা একসময় গরীব ছিলেন; আর এখন ইয়াবার কারবার করে এত বড় লোক হয়েছেন। চট্টগ্রামে এ ধরনের কয়েক ডজন কোটিপতি রয়েছেন যারা মুলত: ইয়াবার বদলৌতে নিজের পাকা অবস্থান তৈরী করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এক শ্রেণির শিল্পপতি ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে ইয়াবার কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন। এটা করতে গিয়ে যে পরিবার সমাজ ধ্বংস করে দিচ্ছেন তারা সেটা প্রথমে টেরই পান না। অথচ সেই ইয়াবার ভয়াল থাবায় চাকরিজীবীদের বেতনের টাকা, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনের টাকা, ব্যবসায়ীদের টাকা এবং বেকার নারী-পুরুষের হাত খরচের টাকা কিংবা মা-বাবার জমানো কষ্টার্জিত টাকা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে সেবনকারীরা নিজের জীবন নি:শেষ করছেন অকালেই। সম্মান হারাচ্ছেন সমাজের মানুষের কাছে। চট্টগ্রামে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

একাধিক সূত্র জানায়, গত ২৭ জুলাই রাতে শহরের স্টেশন রোড এলাকা থেকে ৫হাজার পিস ইয়াবাসহ মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. বেলাল (২৯) ও হেদায়েতুল উলুম হেফজ খানার শিক্ষক আবুল বশর (৩৫)কে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বাড়ী কক্সবাজারে। এরা মূলত: বহনকারী। মিয়ানমারের ৬০ টাকার এই ট্যাবলেট শহরের কোথাও কোথাও ৫শ’ টাকা বিক্রি হয়। এ সুযোগে চট্টগ্রাম এবং আশপাশের জেলার ইয়াবা সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। গত ১৫ মার্চ কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ী দুই ভাই মো. আলম (৪২) ও মো. জসিম উদ্দিন (২৫) ঢাকায় র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন। বড় ভাই আলমের স্বপ্ন ছিল দ্রুত বড়লোক হবেন। আর এ জন্যই বেছে নেন ইয়াবা ব্যবসাকে। ব্যবসায় জড়ান ছোট ভাইকেও। রাজধানীতে নিজে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকছিলেন তারা। ছোট ভাইকে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে দেন। নিজের ফ্ল্যাটে জসিম ইয়াবা বিক্রি করতেন, আবার সেখানেই নিরাপদে ইয়াবা সেবনের জায়গাও করে দেন তিনি। কিন্তু র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পর তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। উদ্ধার করা হয় ১ লাখ ২৩ হাজার পিস ইয়াবা বডি। গত ২৩ জুলাই ল্যাপটপের ব্যাগ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করেছেন চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় বাবা- ছেলেসহ তিনজনকে।

গত ১৬ এপ্রিল আনোয়ারার ইয়াবা সিন্ডিকেটের মুল নায়ক স্থানীয় রায়পুর এলাকার চান মিয়ার ছেলে মোজাহার ধরা পড়েন র‌্যাবের হাতে। মোজাহারের দুই ছেলে দুই মেয়ে। এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেন। আরেক ছেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করা এক মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর কাছে বিয়েও দিয়েছেন তিনি। আরেক মেয়ে চট্টগ্রামে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে পাশ করার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। নগরীতে সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় তার বিলাসবহুল ছয়তলা বাড়িও আছে। এর দ্বিতীয় তলায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন।

গত ৮ এপ্রিল চকরিয়ার ১০হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রামের ২নম্বর গেট এলাকা থেকে নূরুল হুদা নামে এক যুবক ধরা পড়ে ডিবি পুলিশের হাতে। সাত বছর আগেও যে ছিল বাসের হেলপার। আর বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত এলাকার যে ফ্ল্যাটে তার পরিবার থাকে, সেটির শুধু ভাড়াই ৩৫ হাজার টাকা। আয়ের উৎস ইয়াবা। গাড়িও আছে দুটি। বিউটি পার্লারও খুলে দিয়েছেন সুন্দরী স্ত্রীকে। জমি কিনেছেন কক্সবাজার শহরে। কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন চট্টগ্রামেও। গত ৩০ এপ্রিল সকালে গ্রীনলাইন পরিবহনের এসি বাসে কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় নতুন ব্রিজ এলাকায় মহিলা ক্রিকেটার মুক্তা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। মুক্তা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনাসের্র ছাত্রী ছিলেন। নেশার কারণে অনিয়মিত হয়ে পড়ায় তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়। তিনি ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ, মহিলা ক্রিকেট লীগে নিয়মিত অংশ নেন। গত ৪মে হালিশহরের শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্লাটে ধরা পড়েন ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ- কমিশনার মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে ওই অভিযানে ১৩ লাখ ইয়াবাসহ আশরাফ (৩৫) ও হাসান (২৪) নামে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। আশরাফ ছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী। তাদের বাড়ি বান্দরবানের পার্বত্য জেলায়। আশরাফ প্রবাস জীবনে তেমন উন্নতি করতে পারেন নি। তবে দেশে এসে মাত্র এক দুই বছরে ইয়াবা পাচার করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির ওই ফ্লাট ছাড়াও নাসিরাবাদে একটি ফ্লাট ও বাকলিয়ায় একটি প্লটের মালিক তিনি। আরো রয়েছে দুটি গাড়িও।

এর আগে গত বছরের ৩১ আগস্ট সিদ্দিকুল ইসলাম নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সন্ধান মিলে। যার কৌশলের কাছে বারবার পরাস্ত হতে হয়েছিল পুলিশের কৌশলও। তবে শেষরক্ষা হয়নি তার। ইয়াবা পাচারে সিদ্দিকুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন পারিবারিক একটি সিন্ডিকেট। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইয়াবার চালান টেকনাফ থেকে ঢাকায় আনা এবং ঘাটে ঘাটে পৌঁছে দিতে মোট চারটি জিপ ব্যবহার করতেন এ সিদ্দিকুল ইসলাম। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনতে ব্যবহার করেন দুটি জিপ। আর ঢাকায় ঘাটে ঘাটে ইয়াবার চালান সরবরাহ দিতে বাকি জিপটি ব্যবহার করা হয়। ইয়াবাবাহী জিপ পুলিশ রাস্তায় আটকালে অনেক সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের গাড়ি বলে পরিচয় দিয়েও রক্ষা পান তারা। গাড়ি চালানোর জন্য রয়েছে বেতনভুক্ত চারজন দক্ষ চালকও। প্রতি চালানেই তাদের দেয়া হয় বিশেষ ঝুঁকি ভাতাও। সিদ্দিকের তিন ছেলের দু’জনই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। স্ত্রী রশিদা খাতুনও গ্রেপ্তার হয়েছেন দু’দফা। টেকনাফ থেকে মাঝে মাঝে ঢাকায় ইয়াবার চালান নিয়ে আসেন সিদ্দিকের দুই ছেলে রবিউল ইসলাম ও ফরিদুল ইসলাম। পরবর্তীতে নেয়া হয় অভিনব এক কৌশল। চালান আনতে যাওয়ার আগে রবিউল কিংবা ফরিদুল নিজের মোবাইল নম্বরটি আগেই বন্ধ করে দেন। ওদিকে ঢাকার কোনো একটি থানায় সিদ্দিক বা তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে তাদের নিখোঁজ জিডিও করা হয়। যেন চালানসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও আদালতে দেখাতে পারেন, যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি নিখোঁজ হয়েছেন। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যই বের হয়ে এসেছে তাদের গ্রেপ্তারের পর পরেই। আর এ পদ্ধতিতে আদালত থেকে সহজেই জামিন পেয়ে যান তারা।

এরমধ্যে ছেলে রবিউল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যদিও তিনি ঠিকমতো ক্লাস করেন না। তবে নিয়ন্ত্রণ করেন ইয়াবা সিন্ডিকেট। এভাবে ইয়াবা কারবারে জড়িত আছেন চট্টগ্রামের আরো অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি। যাদেরকে প্রমানসহ আটক করার জন্য গোয়েন্দা পুলিশ নানাভাবে মাঠে কাজ করছেন বলে জানাগেছে। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন পরিবহন খাতে বিনিয়োগ করছেন। ইয়াবা বহন করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছে দিতে মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। নানা কৌশলে আসছে ইয়াবা। চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ইয়াবা পাচারকারীদের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে চট্টগ্রামে নতুন বেশ কয়েকজন কোটিপতির সন্ধান মিলেছে। এ নিয়ে গঠিত একটি তদন্ত রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে। এটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও পাঠানো হয়েছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *