আন্তর্জাতিক

ভারতে আবারও নগদ টাকার সংকট!

বিএনএন ৭১ ডটকম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বারের মতো নগদ টাকার সংকটে পড়েছে ভারত। এই সপ্তাহে অন্তত আটটি রাজ্যের এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংক ম্যানেজাররা বলছেন, কয়েক মাস ধরেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। গতবারের মতো এবারও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে সরকারই এই সংকটের জন্য দায়ী। তবে সরকার বলছে, নগদ অর্থের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তৈরি হওয়া সংকট কয়েকদিনের মধ্যেই কেটে যাবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এই খবর জানিয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, অর্থ সংকট অব্যাহত থাকলে নরেন্দ্র মোদির জন্য তা রাজনৈতিক হুমকি হয়ে পড়তে পারে। গত সোমবার দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গাল শহরের রাস্তায় স্কুটারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কুমার লোহাটি। চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বুথ থেকে বুথে ঘুরে টাকা তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন তিনি। এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি বুথে টাকা তোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনও টাকা তুলতে পারিনি।’ ইনস্যুরেন্স এজেন্ট লোহাটি পরদিন বিকেলে বাড়ির পাশের এটিএমে থাকা ভর্তি করা হলে সেখান থেকে টাকা তুলতে সক্ষম হন। গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের মানুষের বিশ্বাস কমেছে। সেকারণে বাড়িতে টাকা রাখার আগ্রহও বেড়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে জুয়েলারি ব্যবসায়ী নীরব মোদিকে অভিযুক্ত করে তদন্তকারীরা। ব্যাংকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে কয়েক বছর ধরে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ চুরির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাতেও ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ব ইন্ডিয়ান ব্যাংকের ওয়ারাঙ্গালের একজন ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক রাধা রানি বলেন, অনেক লোক ভয় পাচ্ছেন। তারা বাড়িতে টাকা রাখছেন না হয় আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। ব্যাংকে রাখা হলে টাকা হারানোর ভয় তাদের। অনেক লোক সরাসরি তাদের এসব কথা বলেছেন বলে জানান তিনি। ওয়ারাঙ্গালে প্রকৌশলীর কাজ করেন ৫৫ বছরের জি গোবিন্দর। তিনি বলেন, তার প্রজেক্টে কর্মরত শ্রমিকদের পে-চেকের মাধ্যমে পারিশ্রমিক দিয়েছেন তিনি। তবে তারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারেনি। দেশের বৃহত্তম ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় তার হিসাব রয়েছে। নিজেও তিনি ওই ব্যাংকের কোনও শাখা থেকে পর্যাপ্ত টাকা তুলতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘৪০ হাজার রুপি তুলতে ব্যাংকে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে বললো, দুঃখিত আমরা আপনাকে ২০ হাজার দিতে পারব। তাহলে আমি কাজ চালাবো কিভাবে?’ ফসল কাঁটা আর বিয়ের মওসুমকে সামনে রেখে টাকার চাহিদা বাড়ছে। এই সংকট তাড়াতাড়ি নিরসন করা না গেলে আরও বেশি গ্রাহক তাদের টাকা ফেরত চাইবে, তখন এই সংকট আরও বেশি বাড়বে।

জি গোবিন্দর বলেন, আমরা ব্যাংকে টাকা জমা রাখি এই কারণে যে যখন খুশি গিয়ে টাকা তুলতে পারব। ব্যাংক যখন টাকা দিতে পারছে না তখন মানুষ ভাবছে ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ না। আর এই কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নগদ টাকার এই সংকটের নির্দিষ্ট কোনও একটি কারণ নেই। বিভিন্ন কারণের সমন্বয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ২০১৬ সালের মুদ্রা বাতিলের পর ভারতের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার নতুন করে ব্যাংক নোট ছাপায়নি। ভারতের নগদ টাকাভক্ত জনগণের কাছে ডিজিটাল লেনদেনে বিব্রত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এর অংশও হয়নি। এছাড়াও ২ হাজার টাকার নোট মজুদ করা শুরু করেছে মজুদকারী আর কালোবাজারিরা। চাহিদা থাকার পরও বড় অংকের মুদ্রা ছাপানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেকারণে কম মূল্যমানের মুদ্রা দিয়ে এটিএম ভর্তি করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। আর চাহিদার কারণে তা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েক দফায় হোঁচট খেয়েছে মোদির সরকার। কয়েকদিন আগেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের শিকার কাশ্মিরের কাঠুয়ার আট বছরের শিশু আসিফা ধর্ষণ নিয়ে চুপ থাকায় সমালোচিত হয়েছে তিনি।

শিশু ধর্ষকদের পক্ষ নেওয়ার জের ধরে কাশ্মিরের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন রাজ্যের সব বিজেপির মন্ত্রী। ২০১৬ সালের নভেম্বরে একই ধরণের নগদ টাকার সংকটে পড়েছিল ভারত। ওই সময় মোদির সরকার হঠাৎ করে কয়েকটি নোট বাতিলের ঘোষণা দিলে ওই সংকট তৈরি হয়। বর্তমান সংকটের মূলে সরকারের নীতি ছাড়াও রয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রতি নাগরিকদের অনাস্থা দায়ী। কয়েকটি ব্যাংক কেলেঙ্কারির কথা সামনে আসায় এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। বেশিরভাগ ভারতীয় অনানুষ্ঠানিক কাজে সম্পৃক্ত। রাস্তার পাশের খাবার দোকান থেকে শুরু করে দৈনিক শ্রমিকের কাজ পুরোপুরিভাবে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল। নগদ টাকার সংকটের কারণে এসব কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও কর্মসংকটে পড়েছেন। টাকার সংকট ছাড়াও বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর সরকারের বাড়তি করের বোঝা চাপানো।

টাকা সংকটের স্থায়ীত্ব বেশি হলে এরপর তার প্রভাব পড়বে অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওপর। মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এসব মানুষ। দিল্লির সোস্যাল সাইন্স ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক অরুন কুমার বলেন, এই সংকট অব্যাহত তা থাকলে ক্ষমতাসীন দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিরোধী দলের নেতারা ইতোমধ্যে এই সংকটের রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার টুইটে লেখেন, কয়েকটি রাজ্যে এটিএম বুথে টাকা শূন্য হয়ে পড়ার খবর দেখেছি। বড় নোট উধাও। মুদ্রাস্থগিতের দিনগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। দেশে কি কোনও আর্থিক জরুরি পরিস্থিতি চলছে?

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *