শিল্প সাহিত্য

মহামিলনের সর্বজনীন উৎসব চাই

যতীন সরকার
পৃথিবীর ক্ষুদ্র বা বৃহৎ সকল জনগোষ্ঠীরই নিজস্ব উৎসব আছে। সেসব উৎসবের মধ্য দিয়েই গোষ্ঠীর মানুষেরা একত্রে মিলিত হয়, পরস্পরের হৃদয়কে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, ব্যক্তিক ক্ষুদ্রতা ও মালিন্যকে সমষ্টির ধারাস্রোতে ভাসিয়ে দেয়।

এরকম মিলনের মধ্যেই উৎসবের আসল সার্থকতা। তবে সমাজের সংহত অবস্থায় উৎসব যেরূপ সার্থকতায় মন্ডিত হয়ে ওঠে, সমাজের সংহতি ভেঙে গেলে উৎসবের সেরূপ অমলিন সার্থকতা আর থাকে না। সমাজে শ্রেণীবিভক্তি যে পরিমাণে প্রকট হয়ে উঠতে থাকে, উৎসবগুলোও সে পরিমাণেই শ্রেণীচরিত্র অর্জন করে ফেলে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সকল শ্রেণীর মানুষ অভিন্ন উৎসবে সম্মিলিত হতে পারে না।

তবু, যাকে আমরা ‘লোকসমাজ’ বলে চিহ্নিত করি, শ্রেণীহীন না হলেও সে-সমাজ আদিম সাম্যসমাজের অনেক উপাদানই আপন অঙ্গে ধারণ করে রাখে। তাই লোকউৎসবগুলোতে যথার্থ উৎসবের লক্ষণগুলো অনি¦ত থাকে, বাঁধাহীন স্বতঃস্ফূর্ততায় সম্মিলিত হয়ে সমাজের সকলে সে-সব উৎসব পালন করে এবং অভিন্ন আনন্দের অংশীদার হয়। তথাকথিত শিষ্ট সমাজে কিন্তুু তেমনটি হয় না। সে-সমাজের মানুষগুলো শিষ্টতার এমন মুখোশ পরে থাকে যে তাদের মুখশ্রী সর্বদা অদৃশ্যই থেকে যায়, উৎসবেও তারা মুখোশ খুলে ফেলতে রাজি হয় না। মুখোশ পরা মানুষ কি অকপট হতে পারে কখনও? অকপট হতে পারে না বলেই তাদের উৎসবগুলোও অকৃত্রিম থাকে না, লোকউৎসবের মতো সেগুলো সম্মিলিত প্রাণের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে না। এবং এরকম প্রাণহীনতার জন্যই তাদের সংস্কৃতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো-বা একেবারে রুদ্ধস্রোতও হয়ে যায়।

এরকম যখন ঘটে যায়, তখনই তাদের আপন সৃষ্ট কৃত্রিম গন্ডি ভেঙে ফেলার কথা ভাবতে হয়, ‘আপন হতে বাহির হয়ে’ বাইরে এসে দাঁড়াতে হয়। শিষ্ট সংস্কৃতি বা অভিজাত সংস্কৃতির ধারকদের তখন কৃত্রিম শিষ্টতা ও আভিজাত্যের অভিমান ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অকৃত্রিম অনভিজাত লোকসংস্কৃতির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে হয়।
বারবার এরকম করতে হয়েছে আমাদেরও। ‘আমাদের’ মানে বাঙালি সমাজের সেই অংশের মানুষদের, যারা বৃহত্তর লোকসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, একটি কৃত্রিম আভিজাত্য ও বৈদগ্ধের বৃত্তসীমায় যাদের অবস্থান। বাংলার লোকসাধারণের সংস্কৃতি থেকেই শুধু নয়, একসময়ে তো এই গোষ্ঠীর লোকেরা বিদেশী ইংরেজির মোহে এমনই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে বাঙালি হয়েও তারা বাংলা ভাষাকেই পরিত্যাগ করতে চেয়েছিল। বাঙালির সৌভাগ্য যে, এরকম ঘোরের হাত থেকে নিজে বাঁচতে ও জাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন সে-সময়কারই মহাপ্রতিভাধর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। হোমার-ভার্জিল-মিল্টনের সৃষ্টির আবেশে আবিষ্ট এই কবি বিদেশী কেতায় শিক্ষিত শিষ্ট বাঙালির দৃষ্টি শুধু কৃত্তিবাস-কাশীদাস-মুকুন্দরামদের লোকায়ত সৃষ্টি সম্ভারের দিকেই ফেরালেন না, বাঙালির লৌকিক উৎসবগুলোকেও তাদের দৃষ্টিসীমায় নিয়ে এলেন। সাম্প্রদায়িক ধর্মের নির্মোক ছিঁড়ে বিজয়া দশমী, কোজাগরী, শ্রীপঞ্চমীর মতো উৎসবগুলো থেকে তিনি লৌকিক নির্যাস আহরণ করে তার চতুর্দশপদী কবিতার ডালি সাজালেন।

মধুসূদন অবশ্য লোকায়ত বাংলার সামান্য কয়েকটি উৎসবকে শুধু তার কবিতারই বিষয়বস্তু করেছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। উত্তরকালের কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ কিন্তুু বাঙালির উৎসব-ভাবনার সীমানাকে কেবল কবিতার বৃত্তেই আবদ্ধ রাখলেন না, কবিতা-গান-নাটক-কথিকাসহ তার সকল সৃষ্টিসম্ভারেই আবহমান বাঙালির উৎসবের উপাদান ছড়িয়ে দিলেন। শুধু সাহিত্য সৃষ্টিতে নয়, লোকায়ত উৎসবগুলোর অন্তঃসার নিয়েই তিনি বাঙালির উৎসবের নবসৃষ্টি ও নবরূপায়ন ঘটালেন। উৎসবের মধ্য দিয়েই তিনি আধুনিক মানুষের সঙ্গে নিসর্গ প্রকৃতীর বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। সে-উদ্যোগের ফলেই তার হাতে বাঙালির ঋতু-উৎসবগুলোতে নতুন মাত্রার সংযোগ ঘটলো, বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব নববিভায় মন্ডিত হলো, ধর্মতন্ত্রী ভাবনাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সকল উৎসব ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন হয়ে উঠলো। বৃক্ষরোপণ বা হল কর্ষণের মতো উৎসবের মধ্য দিয়েও তো রবীন্দ্রনাথ লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনের কাজটিই করলেন।

তবু আরও কিছু কাজ বাকি ছিল। রবীন্দ্রনাথের অলোকসামান্য প্রতিভাও যে ‘গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী’থ একথা মেনে নিলে তার প্রতি মোটেই অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় না। বরং স্বীকার করে নেয়া সঙ্গত যে সহস্র রশ্মি রবির আলোও সর্বত্র প্রবেশ করতে পারেনি। অথচ কী আশ্চর্য, মধ্যাহ্ন রবির তীব্র আলোক-প্রবাহের ভেতরই উদয় ঘটলো অদৃষ্টপূর্ব এক ধূমকেতুর। সেই ধূমকেতুটিরই নাম নজরুল। এই নজরুলই ধূমকেতুর আলোর প্রক্ষেপণ ঘটিয়ে ঈদুল ফিতর, কোরবাণী বা মহরমের মতো উৎসবগুলোর অন্তর্নিহিত সর্বজনীন তাৎপর্য উ ঘাটন করে দেখালেন এবং শ্রেণীবিভক্ত সমাজের শ্রেণীশোষণের অবসান ঘটিয়ে এসব উৎসব কী করে সকলের জন্যই সমান সার্থক হয়ে উঠতে পারে তারও পথসন্ধান করলেন। রমজানের রোজার শেষে যে খুশির ঈদ আসে, তার খুশি থেকে যে বঞ্চিত থাকে অগণন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ- নীরবরণ স্পষ্টতায় সে-সত্যটি তিনি তুলে ধরলেন। ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে নি নিদ’, মুমূর্ষুু সেই কৃষকের ঘরে যে ঈদ আসে সে-ঈদ তো খুশির বদলে কান্নাই বহন করে আনে। সে-কান্না ঘোচানোর দায়িত্ব গ্রহণ না করে ঈদের উৎসবে মেতে থাকতে চায় যারা, তাদের অপরাধ তো সীমাহীন। সমাজ থেকে সেই অপরাধের উৎখাত ঘটানোই হলো সকল উৎসবের সার্থক ও সর্বজনীন হওয়ার প্রাক্শর্ত। আবার সেই প্রাক্শর্ত পূরণের জন্যও প্রয়োজন উৎসবগুলোর বাইরের পর্দা সরিয়ে ভেতরের দিকে দৃষ্টি দেয়া। নজরুল সেই প্রয়োজন সাধনের দায়িত্বই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কোরবাণী উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার অন্তরালবর্তী মর্মার্থটি নিষ্কাশন করে সকলকে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন- ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ ছাতিফাটানো মাতম করেই যে মহরমকে সার্থক করা যায় না, সকলকে সে-কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েই তিনি বলেছিলেন
ফিরে এল আজ সেই মহরম মাহিনা
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।
’ত্যাগের মধ্য দিয়ে ভোগ করা’র ঔপনিষদিক শিক্ষা তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সকল সৃষ্টিতেই অভিব্যক্তি পেয়েছে, নজরুলও অগ্রজ কবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই অভিব্যক্তিকে আরো তীক্ষœ করে তুলেছেন। যেমন- শারদীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময়ে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ আনন্দে যখন দেশ ছেয়ে গেছে, তখনও ধনীর দুয়ারে কাঙালিনী মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তীব্র বিষাদে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কাঙালিনীর অশ্রুমোচনের উদ্যোগ গ্রহণ না করতে পারলে তো উৎসবের সমস্ত আয়োজনই ব্যর্থ ও মিথ্যে হয়ে যায়, ‘মিছে সহকার শাখা, মিছে ঐ মঙ্গল কলস’। নজরুল এরকম ব্যর্থ ও মিথ্যা পূজা-উৎসবকে আরো কটু ভাষায় আক্রমণ করেছেন, ‘পূজা অভিনয়’ আখ্যা দিয়েছেন একে। বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্য অনুসারে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে রাবণবধের শক্তিলাভের আকাক্সক্ষায় রামচন্দ্রের অকালে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানের স্মারক। কিন্তুু এখনকার বাঙালি যে দুর্গাপূজা করে তাতে তো রাবণবধের কোনো আর্তি থাকে না। নজরুলের বিবেচনায় একালের রাবণ হচ্ছে গরিবের রক্ত শোষণকারী ধনিকরা। ‘দশমুখো ঐ ধনিক রাবণ দশ দিকে আছে মেলিয়া মুখ/বিশ হাতে করে লুণ্ঠন তবু ভরে নাকো ওর ক্ষুধিত বুক।’ লুণ্ঠনকারী ধনিকদের উৎখাত করার প্রযতœ গ্রহণ করেই কেবল একালের দুর্গোৎসব সার্থক হতে পারে। শুধু দুর্গোৎসব কেন, এরকম প্রযতœ গ্রহণ ছাড়া কোনো উৎসবই সকলের জন্য সার্থক হয়ে উঠতে পারে না।
এ-রকম প্রযতœ যে আমরা একেবারেই গ্রহণ করিনি, তা নয়। দেশি-বিদেশী গণবিরোধী শাসক-শোষকদের হাত থেকে আমাদের উৎসবগুলোকে রক্ষা করার জন্য আমরা অনেক সংগ্রাম করেছি। সংগ্রাম করে করেই আমরা নববর্ষ ঋতুবরণ বা নবান্নের মতো উৎসবগুলো পালনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি ও এসবের নবজন্ম ঘটিয়েছি। ধর্মীয় উৎসবগুলোকেও ধর্মসাম্প্রদায়িকতার গন্ডি ভেদ করে সর্বজনীনতার উদার অঙ্গনের কাছাকাছি নিয়ে আসতে কিছুটা হলেও সমর্থ হয়েছি। তবু এরপরও আত্মপ্রসাদে অতিপ্রসন্ন হওয়ার মতো বড় কিছু যে আমরা করে উঠতে পারিনি, সেকথা স্বীকার না করলে আত্মপ্রতারণারই শিকার হতে হবে।

লুটপাটভিত্তিক অর্থনীতির বদৌলতে আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছে যাদের, তারা তো ধর্মীয় উৎসবসহ সকল উৎসবকেই বিত্ত ও ক্ষমতার কদর্য প্রদর্শনীতে পরিণত করে ফেলেছে। ধর্মান্ধ উগ্রবাদি ও মতলববাজ ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মের নামেই ধর্মীয় উৎসবকে সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বদ্ধ করে রাখছে ও ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আবার উদার মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতিসেবীরা শহর-নগরে যেসব ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের আয়োজন করেন, সেসবও তো হয়ে আছে নাগরিক মধ্যবিত্তের একটি ক্ষুদ্র অংশের উৎসব মাত্র। গ্রাম-শহর বা শ্রেণীর গন্ডিভেদকারী মহামিলনের সর্বজনীন উৎসব এখনও আমরা প্রবর্তন করতে পারিনি। বৈষম্যমূলক সমাজ-ব্যবস্থাটিকে ভেঙে না ফেলে তেমনটি করাও যাবে না।
কাজেই অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করা এখনও বাকি রয়ে গেছে আমাদের।
(সংকলিত)

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *