সারা বাংলা

বাংলা নববর্ষের কথকতা

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম
যাত্রা হল শুরু,নতুন বছরের আজ পয়লা দিন; বাংলা সনের পঞ্জিকা মোতাবেক ১৪২৫ পয়লা বৈশাখ। কথা মুখে নিবেদন করে চাইছি যে, বাঙালি আমাদের জীবনে বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত এই দিবস। সারাটা মনপ্রাণ উদ্বেলিত করে আবেগের জোয়ার; এবং এখানেই নয় অবশ্য ইতি। চোখ ছাপিয়ে ভাসে কত যে আশার স্বপ্ন, আমরা অমঙ্গল-প্রতিরোধের শপথে উজ্জীবিত হয়ে উঠি। আর নয় শুধু দিন যাপনের, প্রাণধারণের গ্লানি। প্রার্থনার উচ্চারণ আমাদের- ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ’ পাপ-অভিশপ্ত জোটকে ধ্বংসের ‘প্রলয়োল্লাসে’ এবং ‘নূতন সৃষ্টি উল্লাসে’ দীক্ষামন্ত্রে আমাদেরকে সঞ্জীবিত করে তোল। আন্তর-বিশ্বাসে ধারণ করি যে, গভিড়ে মৌল সত্যটা রয়েছে এইখানে।

বলা হচ্ছে, পয়লা বৈশাখ বাঙালি জনমানুষের জীবনে বিশেষ এক ‘উজ্জ্বল’ দিবস। একই সাথে প্রাসঙ্গিকতায় অবশ্য জেনে রাখব রয়েছে আমাদের জন্যে গুরুত্ব তাৎপর্যের আরো আরো ‘দিবস’ কথা। সেই সবের উল্লেখ খানিক পরে।
কতিপয় এমন থেকে থাকে তা সব কালের ধর্মের ফসল, প্রকৃতীর নিয়মে নিয়ন্ত্রিত। এবং আবার এমনতর কতিপয়; সেইখানে ইতিহাস-নিয়তির ভূমিকা, পর্বে পর্বান্তরে ইতিহাস কথা কয়। আমাদের জীবনে অর্জনের বিশেষ চিহ্নে দীপ্র দীপ্ত ঐসব ‘দিবস’ আমরা উদযাপন করে থাকি। এবং যুগপৎ সেই অবলম্বনে আত্মআবিষ্কারে ব্রতী হয়ে উঠি, বৈরী দুশমন অপশক্তির মুকাবিলায় শপথে আমরা কমিটেড্ হই।

আজকের এই অবকাশে অবলোকনের প্রয়াস পাচ্ছি। বছর ভরেই তো আমাদের নানান সব দিবস পালনের আয়োজন। প্রস্তাব যে, এই প্রেক্ষিতে মোটামুটি দু’টি বিভাজন লক্ষ্য করব। যেমন কি না, এই শুরু হয়ে গেল বাংলা নূতন সনের ‘পয়লা বৈশাখ’। এবং অতঃপর ঐ যে ইতিহাস-তাৎপর্যের কথা উল্লিখিত হয়েছে; সেইখানে রয়েছে আমাদের ‘অমর একুশে ফেব্রুয়ারি’, ‘৭ই মার্চ’, ‘২৬শে মার্চ’, ‘১৬ই ডিসেম্বর’ ইত্যাদি। এবং আরো রয়েছে রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তীর মতো দিবস উদযাপনের উদ্যোগ-আয়োজন। এই সবতাতেই অবশ্য জড়িয়ে থাকে আবেগের, আনুষ্ঠানিকতার মাতামাতি। স্বাভাবিক তা এবং তারপর আমরা অন্তর্লীন গভিড়ের সত্যটাকে আত্মস্থ করে নেয়ার প্রয়াস পেয়ে থাকি।

অতএব বিশেষ জোর দিয়েই বলতে চাই যে, বছরে বছরে গোটা দেশজুড়ে (এবং দেশের বাইরেও নানাস্থানে) অমন আন্তরিকতায় আমাদের বিশেষ বিশেষ দিবসের উদযাপন। কেবলি শুধু এমনি এমনি নয় কিন্তুু, এবং রুটিন বাঁধা আনুষ্ঠানিকতাতেই ইতি হয়ে যায় না। গোড়াতে নিশ্চয় করেই কাজ করে যায় আপন ইতিহাস-অর্জনের তাগিদ। সচেতন সবারই তা জানা। মনে করি যে, প্রবীণের জন্যে ফরজ দায়িত্ব এখন- ঘরের সন্তান নবীন প্রজন্মকে পূর্বোক্ত ঐসব আপন-উত্তরাধিকারের সন্ধান দেয়া। ‘দিবস’ উদযাপন নিশ্চিতভাবেই এ সুযোগটা এনে দেয়।

বিশেষ বর্তমানের উদ্দিষ্ট প্রসঙ্গটিতে এখন ফিরে আসা যাক। একটা সময় গেছে, তখন পাকিস্তানিত্বে আর মোল্লাকীতে জোট বেঁধে ওরা আমাদের ‘পয়লা বৈশাখ’ উদ্যাপনে ঝঞ্ঝাট বাঁধাত। ওদের সরাসরি প্রচারণা ছিল, এ যে ‘বাঙালিত্ব’, অর্থাৎ না-পাক হিন্দুয়ানী। বরং আপত্তি নাই (অগ্নি উপাসকদের কালাবধি) ইরানী ‘নওরোজ’-এ। খৃষ্টীয় ক্যালেন্ডারের ‘নিউ ইয়ার্স ডে’, তাও সই, কিন্তুু বাঙালির ‘নববর্ষ’ ‘পয়লা বৈশাখ’? নৈব নৈব চ। যেমনটা বারংবার করেই প্রতিবন্ধকতা আসত ‘রবীন্দ্রজয়ন্তী’র অনুষ্ঠান নিয়ে, এমন কী ‘নজরুলজয়ন্তী’র উদযাপনও সহজ তেমন হত না। এদিকে আমরাও অবশ্য বিশ্বাসে বুঝে নিয়েছিলাম কোন্ বাণী বহন করে বাংলা নূতন বছরের পয়লা বৈশাখ। যেমন কিনা বাঙালিত্বের ঠাঁই ঠিকানা আবিষ্কার করে নেয়া গিয়েছিল ‘ভাষা আন্দোলনে’ রবীন্দ্র-নজরুল প্রতীকে।

এই একটা সোজা অঙ্ক হিসেবের কথা। পাকিস্তানঅলা ওদের কিন্তুু কোনই ওজরআপত্তি নেই খৃষ্টান গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের দিন-মাস-বছর গণনায়। আর হিজরী সন গণনা, তা তো ইসলামী ‘তারিখ’ মেনে নিয়েই তৈরি। বিরোধিতা যত যা তা সব বাংলা সন মোতাবেক ‘বৈশাখী’ নিয়ে। কেন? ইতোপূর্বে খানিক তা আভাসিত করা গেছে। অথচ সৌর সন আর চান্দ্র সন এ দুয়ে মিলিয়ে যে নতুন করে বাংলা সনের শুরু, এবং তা মোঘল সম্রাট আকবরের (খৃ. ১৫৪২-খৃ. ১৬০৪) উদ্যোগেথ সে ইতিহাস কে বোঝাবে ঐ সকল জ্ঞানপাপীকে? আর, সম্পঁর্ণতই ছিল সেই কর্ম আর্থ-সাম্রাজ্য স্বার্থে, কৃষক প্রজাদের ফসল উৎপাদনের সাথে, খাজনা আদায়ের সুবিধার সাথে সম্পর্কিত।

অতঃপর লক্ষ্য করছি এমন করে যদি কথাটাথ বাংলা সন চোদ্দোশো বারো সাল; এ থেকে বেরিয়ে আসছে কোন্ সত্য বাস্তবতা? ‘বাংলা’র সাথে দিব্যি মিশে যাচ্ছে মূলতই আরবি শব্দটি ‘সন’ এবং অনুরূপ যখন সেটি ‘সাল’, আদপেই সেটি ফারসী থেকে নেয়া। প্রসঙ্গত, জেনে রাখবার যে মধ্যযুগের বাংলাদেশে তখন সংস্কৃতি-সমন¦য়ের বিশেষ এক পালা। কেমন অবলীলায়, স্বতঃস্ফূর্ততায় সমনি¦ত হয়ে যাচ্ছে দেশজ বিদেশাগত নানা সব ধারা। বাংলা সনে পেয়ে যাই তেমনই এক প্রতিফলন। আবার এইখানেতে দেখি আরেক রূপের অবয়ব। প্রকৃতী ভুবনের আধারে লালিত বাংলা বর্ষ পরিক্রমা। বিশাখা নামের নক্ষত্র থেকে নেয়া বৈশাখ দিয়ে শুরু, এবং চিত্রা নক্ষত্রের চৈত্রে পৌঁছে হয়ে আসে অবসান।
এবম্প্রকারের কত না বৈচিত্র্যে অনন্য ঋদ্ধ আমাদের বাংলা সন। আপাতত এখন সবশেষে যোগ করব- বিখ্যাত রাজ রাজড়ার নাম, তাঁদের সিংহাসন-আরোহণ কাল, কিংবা অপরপক্ষে ধর্মপ্রচারকের নাম, কী উল্লেখ্য ধর্মীয় আবহ নয় যুক্ত এই সন পরিচিতির সাথে।
(সংকলিত)

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *