লিড নিউজ শিল্প সাহিত্য

নববর্ষ : আত্মপোলদ্ধির নতুন অধ্যায়

জামিরুল ইসলাম শরীফ
নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গে অহেতুক গৌরববোধ কারো কারো স্বভাবগত। কথাটা একটু সরল শোনালেও, যার নিরুদ্ধে নালিশ আমার অন্তঃপীড়ার কারণে বলেছিল সে, ‘তোমাকে দিগন্ত দেখাতে নিয়ে যাবো’। ঘুমোতে দিলে না, বরং উঠিয়ে নিয়ে গেলে রাজকন্যার মতো, আকাক্সক্ষার নতুন ভোরে। জগতে জাগতিক নিয়মের তৈরি পাল্লাটা আমার পক্ষে যথেষ্ট ভারী। কোনো অনিষ্ট কারবারের অজ্ঞতাজনিত ভয় আর অনাসৃষ্টির আশঙ্কায় সে যাত্রা ভঙ্গ হয়েছিল। কিন্তুু কোন বিরামহীন চরকাকাটার নিশ্চিন্ত ঘূর্ণনের আত্বোপ্রসাদে কাল কাটান তিনি? তা এই অবধি রহস্যপ্রিয় হয়ে আছে। অভিজ্ঞতা নয়, এ আমার অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রকাশ।

মানুষ তার হৃদয়কে যতখানি ছড়াতে পারে, তার জাগতিক পরিমন্ডলের যতটা তার মনে ছায়া ফেলে, সেই পরিমাণে তিনি মানুষ, সেই পরিমাণেই তিনি মৌলিক। ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপারটা এভাবে বুঝলেও, ব্যক্তিবিশেষথ সাধারণের মতের পার্থক্য বা বিরোধ ঘোচে না; কারণ অভিজ্ঞতা এবং উপলদ্ধিব্যঞ্জনা, এই দুই ক্রিয়া সমান নয়, এদের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এর পিছনে মানুষের বংশানুক্রমিকথ পারিবারিক সংস্কার, তার সমাজ ও রাষ্ট্র, শিক্ষা ও দীক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য, চেতনা ও স্বাতর্ন্ত্য, সাধনা ও সংযম সমস্তই তার মধ্যে প্রতিফলিত। আমরা সেখানেই প্রতীক দেখি, যেখানে অনেক মিশ্র ভাব একটি বস্তুর চারিদিকে দানা বাঁধে, যার অনুগ্রহে যুক্তির বা মত পার্থক্যের বিরোধ সত্ত্বেও বস্তুর একক সংস্পর্শ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মতোই অন্যের অন্তরে পৌঁছে যায় উপলব্ধির সুড়ঙ্গ বেয়ে। শুরুর রেশ ধরে বলতে চাই, আজ বর্ষদিনের প্রথম সকালের অরুণ আভায় জগৎ রূপসীর শুভ্র ললাটে চুম্বনের উন্মুখতা, আর ঋতুবিধানে গ্রীষ্মে পাতাঝরার ছন্দের নূপুর-নিক্বণ ধ্বনির অদ্বিতীয় দ্যোতনায় প্রকৃতীর চিত্রার্পিত যে প্রেক্ষাপটথ সেই-ই আকাক্সক্ষার নতুন ভোর। সেই তো আমাদের নববর্ষের প্রথম প্রহর।

’বিধির বিধানে কর্মের টানে’ আমাদের প্রতিদিনের সকাল কর্মের অভ্যাসে অস্থির। নৈমিত্তিক কাজে প্রয়োজনের সীমানার মধ্যেই সে বন্দী। এর অতিরিক্ত কোনো তাৎপর্য অন্তর্লোকে প্রবেশের অধিকাংশ পথ থাকে রুদ্ধ। আজ নববর্ষদিনে চেতনার সব কপাট খুলে গেল ছন্দ ও ধ্বনির, সঙ্গীত এবং নৃত্যের নিবেদিত অনুধ্যানে, একদেশ একপ্রাণের জয়গানে। ভাব এবং ভাবনা প্রকাশের বিশিষ্টতা তার ছন্দ ও ধ্বনির চাঞ্চল্যে। চারদিক অনুরণিত সব সুরের নির্যাসে একটিই সুরথজাগো, নব আনন্দে জাগোথ যা প্রকৃত অর্থে বাঙালির।

রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের নিত্যসঙ্গী, উৎসব- অনুষ্ঠান আয়োজনের সূত্রধার। বাংলার আধুনিক সংস্কৃতির- বিস্ময়কর সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথে, আর অধঃপতিত নির্যাতিত বাংলা ও বাঙালিকে পূর্ণগৌরবে প্রতিষ্ঠিত যার হাতেথ তিনি বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী বঙ্গবন্ধুর বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতা এবং মুক্তির ঘোষণায় দেশ এক অপূর্ব শক্তিতে উথলে উঠল, সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে বাঙালি গৌরবে ভরে উঠেছে, ধন্য হয়েছে, তার জীবন সার্থক করেছে। রবীন্দ্রনাথে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির এবং বঙ্গবন্ধুতে বাংলাদেশ ও বাঙালির চিরপরিচয়ের অসীমের নিমন্ত্রণপত্র- যা আমাদের জন্য রেখে গেছেন। ব্যাপারটা খুবই জাগতিক এবং স্বয়ংসিদ্ধ আুোপলব্ধির এক চমৎকার ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। দু’জনেই পৃথক বৃত্তির মানুষ, সেখানের ব্যক্তিস্বরূপে রহস্যঘনতার স্থান নেই বলে তাঁরা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং আমাদের চিরস্মরণীয়।

আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এমনকি সামাজিক বৈশিষ্ট্য বিকাশের ক্ষেত্রে বিশ্বসভায় বাঙালির সচেতন নাগরিক অধিকার ও মুক্তি, সর্বোপরি আধুনিক হওয়ার যে সংকট তা থেকে উত্তরণে অন্তঃপ্রেরণায় আছেন বিশ্বজনচিত্তজয়ী এই দুই বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভুবন রচনায় ঐক্যবোঁধের অন্যতম উদ্যোক্তা, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবোঁধে উদ্বোধিত করে আন্তর্জাতিক ঐক্যের শুদ্ধতম প্রণেতা। বলতে চাইছি, এখানেই সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও দু’জনে অবাঁধ, অনায়াস ও প্রায় সমান্তরাল ভাবনায় যুক্ত হয়ে আমাদের আত্মোপলদ্ধির এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টির নিরন্তর প্রবাহে সর্বত্র বেগবান। এ দুই মানবসত্তা যেহেতু দেশ-কালের উপাদানেই তৈরি এবং অন্তর ও বহির্জগৎ সম্বন্ধে নিরাগ্রহ নন, বরং তাঁরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সার্বভৌম রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং রেখেও গেছেন; সেই প্রতিনিধিত্বে তাঁরা বাঙালির আধুনিক জীবননির্মাণ এবং জীবনযাত্রারও প্রতিনিধি। এখনো যেহেতু উভয়েরই পক্ষে যথেচ্ছাচার গুণ-কীর্তনের লোকের অভাব হয় না, এমনকি তাঁদের বাণী-নাম কীর্তন ব্যতীত যেন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও লাভ হয় না। এসব বাহুল্যবর্জনই সভ্য এবং সুশোভন। রবীন্দ্রনাথের মতো এত বড় লেখক এবং বঙ্গবন্ধুর মতো দুর্জয় ও মননশক্তির অধিকারী ও অপরাজেয় এবং মৃত্যুঞ্জয় লোকের এত দিনকার সহযোগকে আমরা যথেষ্ট উপকারে লাগাতে পারিনি। এর দায় ও পরিণাম আমাদের।

আজকে সময় এসেছে আমাদের ব্যর্থ-জীবনের ব্যথিত ইতিহাস কোনকালেই যেন রচনা করতে না হয়; সে প্রত্যয়ে আজ এই উৎসবের ভিতর দিয়ে এমন একটা জীবননির্বাহীনীতির দৃষ্টান্ত খুঁজে নিতে হবে, যা আমাদের ঐতিহ্যশ্লিষ্ট সময়কে শক্তি, শৌর্যের, শান্তি ও ধৈর্যের উত্তরাধিকারে ফিরিয়ে নেবে। যে ঐতিহ্যের স্বরূপেথ ট্রাভিশনের ধারায় বাঙালির আত্মপরিচয় ও দর্শন নিহিত। এবং যে ঐতিহ্যপরম্পরায় সে অনুপ্রাণিত; তার স্বরূপ বুঝতে গেলে তার উৎসবকে বাদ দেয়া যাবে না। যদিও তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সময়ের বিবর্তনায়থ ইতিহাসে ঐতিহ্যে রূপান্তর ঘটায়। তা-ও এই পরম্পরাগতভাবেই অনুপ্রাণিত। কিন্তুু সে যেন চিরাচরিত প্রথার নিশ্চিন্ত অনুকরণ না হয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় জমতে থাকা মলিনতা, ব্যর্থতার আবর্জনা ও অবসাদগুলো বর্ষ-উৎসবের আনন্দ-কোরাসেই কেবল ধুয়ে-মুছে যাবে, তার ছবি দেখবো কবে? আবার যে সেই সম্ববৎসরের অপেক্ষাথ সেই একই মঞ্চ, একই আহ্বানের গীত ও বাণী, কিংবা আরও বৃহৎ পরিসরের কোনো আয়োজন- তা হবে কেবলই বিনোদন, গোষ্ঠীগত বাণিজ্যিকীকরণ, অর্জন নয়। এও যে আমাদের শ্রেষ্ঠজনদের কাছ থেকে সরে থাকার ব্যর্থতারই গ্লানি।

অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তির মধ্য দিয়ে আমরা গেছি, আজ ভোরের অনিশ্চয় যাত্রা ছেড়ে, সবেমাত্র প্রভাতের আলোকে এসে পৌঁছেছি, সম্মুখে শুধু সম্ভাবনার অবাঁধ প্রান্তর। বাঙালির মহাকাব্যের মহানুপ্রেরণা মূর্তিমান হয়ে উঠতে পারে। অবাঁধ প্রান্তরে বেজে উঠতে পারে সেই গ্লানি মোচনের মহাসঙ্গীত। আমরা নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে যায়নি, এখনো অবশিষ্ট আছেন নেতৃত্ব দেয়ার মতো রাজনীতিক, আছেন চিন্তাবিদ, শিক্ষাব্রতীরা। সাংস্কৃতিক জগতের এক একটি আলোকস্তম্ভ এখনো নাক্ষত্রিক উজ্জ্বলতায় দ্বীপ্যমান। আছে নববর্ষের নহবত হাতে উদ্দাম বসন্তের যৌবন তরুণদল, বজ্রনির্ঘোষে বাজবে নতুনের ঐকতান- বর্ষশুরুর সঞ্জীবনী মন্ত্রে গাথা হবে আুোপলব্ধির পরম মাল্যরচনা।
(সংকলিত)

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *