অর্থনীতি লিড নিউজ

ডলার সংকটে আমদানি দায় পরিশোধ করতে পারছে না বেসরকারি ব্যাংকগুলো!

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: দেশের বেসরকারি অনেক ব্যাংকই আমদানি দায় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন প্রজন্মেও ৯টি ব্যাংক ছাড়াও ওই তালিকায় আছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), বাংলাদেশ কমার্স, টিওমিয়ার, ঢাকা, এক্সিম, আইএফআইসির মতো ব্যাংকও। ওসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বড় বড় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েও প্রত্যাশিত ডলার না পেয়ে বিকল্প উপায় হিসেবে ওডির মাধ্যমে এলসির দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। মূলত ফান্ড সংকটের কারণে কোনো ব্যাংক আমদানি দায় পরিশোধ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নস্ট্রা অ্যাকাউন্ট ওডি করে দেয়া হয়। যা যেকোনো ব্যাংকের জন্যই বিপজ্জনক ধাপ। কারণ এর মাধ্যমে ব্যাংক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের ব্যাংকগুলোকে খাদ্যশস্যসহ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির বিপুলসংখ্যক এলসি খুলতে হয়েছে। সে তুলনায় রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় না বাড়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে এলসির দায় পরিশোধে অনেক ব্যাংককেই অন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। আর চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৮০ কোটি ডলারের বেশি বাজারে ছেড়েছে। তারপরও টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি থামছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৭৯ টাকা ৭০ পয়সা। চলতি বছরের একই দিন তা ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ৮২ টাকা ৯৬ পয়সায়। তবে বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে আরো বেশি দামে। আর অধিকাংশ ব্যাংকই ঘোষিত মূল্যের বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে।

সূত্র জানায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহে ২ বছর ধরেই ভাটা পড়েছে। পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়ায় বেড়েছে আমদানি ব্যয় পরিশোধ। ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের চলতি হিসাবে ৫৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ওই ৭ মাসে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮৯ কোটি ডলার। তার আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চলতি হিসাবে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৫ হাজার ২০ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে। অথচ ওই সময়ে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমার পর গত অর্থবছর রেমিট্যান্স সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে। সেই সঙ্গে গত অর্থবছর আমদানিতে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে রফতানি আয় বাড়ে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো নিজেদের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারে না। সেজন্য নির্ধারিত সীমা বেঁধে দেয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক দিন শেষে তার মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে দিন শেষে বাজারে বিক্রি করতে হয়। বিক্রি করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হয়। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যাংক ঘোষিত মূল্য লঙ্ঘন করে ডলার কিনে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। আর বড় ব্যাংকগুলো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সুযোগ নিচ্ছে। যার ফলে বাজারে ডলার সংকট কাটছে না। অথচ সংরক্ষণের হার কিছুটা কমিয়ে দিলে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ডলার বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হবে।

এদিকে এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে ভালো ব্যাংকগুলোকেও আমদানি দায় পরিশোধে সমস্যায় পড়তে হবে বলে জানান ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স কম থাকলেও ঢাকা ব্যাংকের রফতানি আয় ভালো। ফলে এ মুহূর্তে আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকটির সমস্যা হচ্ছে না। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামীতে ভালো ব্যাংকগুলোকেও আমদানি দায় পরিশোধে বিপত্তিতে পড়তে হতে পারে।

অন্যদিকে ডলারের বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নজর রাখছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সহনশীল রাখতে প্রতিনিয়ত ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আশা করা যায় পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *