বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

বিদেশি ক্ষতিকর উদ্ভিদ ও প্রাণী

বিধানচন্দ্র দাস
কয়েক বছর আগে ওয়েলসের (যুক্তরাজ্য) ব্যাঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে বেশ কয়েক বার যেতে হয়েছিল এবং প্রতিবারই প্রায় মাসাধিককাল থাকতে হয়েছিল। প্রথমবার যাওয়ার কয়েক দিন পরেই ব্যাঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার রিসার্চ পার্টনার ড. জুলিয়া জোনস আমাকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের অন্যতম পর্যটন এলাকা স্নোডোনিয়া পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিল। ব্যাঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই ছিল জায়গাটি। প্রথম দর্শনেই স্নোডোনিয়াকে আমার ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে যখন দেখলাম যে আশির দশকে আমার হিমালয়ে বসবাসের সময় যে রডোডেনড্রন ফুলগুলো ভালো লাগত তার একটি জাত (বেগুনি রঙের ফুল) স্নোডোনিয়ার গোটা এলাকায় বিপুল সংখ্যায় ছড়িয়ে আছে। আমার সেই ভালো লাগা অনুভূতির কথা ড. জুলিয়াকে বলতেই দেখলাম, সে যেন কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। পরক্ষণেই সে বলল, রডোডেনড্রনগাছ তোমার যতই ভালো লাগুক, তা ওয়েলস সরকারের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। পরে জানলাম যে এই গাছ ২০০ থেকে ২৫০ বছর আগে যুক্তরাজ্যে ছিল না। শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে ভূমধ্য সাগরীয় কোনো দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। ২০০ থেকে ২৫০ বছরের ব্যবধানে এই গাছ যুক্তরাজ্যের কোনো কোনো এলাকায় রীতিমতো আগ্রাসী গাছ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাটির গুণাগুণ পরিবর্তন, পরাগায়ণ পতঙ্গের সংখ্যা হ্রাস, উদ্ভিদ ধ্বংসকারী নানা রোগ-জীবাণুর আধিক্য ইত্যাদি সমস্যা এই গাছ সেখানে তৈরি করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে সেনাদের মালবাহী জাহাজের মাধ্যমে পাপুয়া নিউ গিনি থেকে বাদামি গেছোসাপ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়ামে চলে আসে। বিগত সাত দশকের মধ্যে সেই সাপ গুয়াম দ্বীপের ১০-১১টি পাখি প্রজাতি ধ্বংস করাসহ সেখানে বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় সংঘটিত করেছে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আফ্রিকার বিশাল ভিক্টোরিয়া হ্রদে রাক্ষুসে তেলাপিয়া মাছ ছাড়ার পর প্রায় ৬৯ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেই হ্রদের দুই শতাধিক স্থানীয় মাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হাওয়াই দ্বীপে নতুন বসবাস স্থাপনকারীদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া পোষা পাখির মাধ্যমে সেখানকার ১০টি স্থানীয় পাখি প্রজাতি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঘটেছে।

তত্ত্বগতভাবে পৃথিবীর কোনো উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী প্রজাতি ক্ষতিকর নয়। একটি বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে যত জীব প্রজাতি বসবাস করে, তারা প্রত্যেকেই সেই বাস্তুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিতে পারে তখনই, যখন একটি উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী প্রজাতি এক বাস্তুতন্ত্র থেকে ভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে কিংবা তার বিস্তার এলাকার বাইরে সম্পূর্ণ নতুন এলাকায় গিয়ে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। নতুন বাস্তুতন্ত্রে কিংবা এলাকায় আগমনকারী প্রজাতিকে বলা হয় পরক প্রজাতি (এলিয়েন স্পিসিস)। অনেক সময় পরক প্রজাতি স্থানীয় অন্যান্য প্রজাতির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেয়। পরক প্রজাতির দ্রুত বংশবৃদ্ধিজনিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিঘাতে স্থানীয় প্রজাতি বিনষ্ট হলে কিংবা তা মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হলে এই ধরনের পরক প্রজাতিকে আগ্রাসী পরক প্রজাতি (ইনভেসিভ এলিয়েন স্পিসিস) বলা হয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য বিশেষজ্ঞরা যে পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন তার মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আগ্রাসী পরক প্রজাতি।

বাংলাদেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতি সম্পর্কে গবেষণা অপ্রতুল। তবে দৈনিক পত্রিকায় মাঝেমধ্যে বিদেশি দু-একটি ক্ষতিকর উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো চ্যানেলেও এ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। বাংলাদেশে বিদেশি প্রজাতিগুলো ক্ষতিকর কি না, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা রকম আলোচনা আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে হতে দেখা যায়। তবে বেশির ভাগ সময় এসব বিতর্ক বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণা ফলাফলনির্ভর না হয়ে তা অনুমাননির্ভর হয়ে থাকে। যেমন-আকাশমণি, ইউক্যালিপটাসগাছ; আফ্রিকান মাগুর, পিরানহা মাছ ইত্যাদি নিয়ে এ ধরনের মীমাংসাহীন বিতর্ক প্রায়ই হতে দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি এক ধরনের ধন্দ তৈরি করেছে। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতি সম্পর্কে গবেষণার জন্য স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বিষয়টি খুবই জরুরি।

জাতিসংঘের সিবিডিতে (কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরে আগ্রাসী পরক প্রজাতির অনুপ্রবেশ, নিয়ন্ত্রণ বা ধ্বংস করার জন্য সম্মতি প্রদান করেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ‘এনবিস্যাপ (ন্যাশনাল বায়োডাইভারসিটি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান) ২০১৬-২০২১’ প্রতিবেদনের অনেক জায়গায় আগ্রাসী পরক প্রজাতি দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে কচুরিপানা, কাসুন্দি, আসামলতা, বনক্ষীরা, ঘ্যাগ, ঢোলকলমি, কেশরধাম, লজ্জাবতী, পার্থেনিয়ামসহ ১৫টি উদ্ভিদ প্রজাতিকে আগ্রাসী পরক প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে কোনো প্রাণী প্রজাতির নাম সেখানে নেই। নিউজিল্যান্ডভিত্তিক ইনভেসিভ স্পিসিস স্পেশালিস্ট গ্রুপ (স্পিসিস সারভাইভাল কমিশন (আইইউসিএন) বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন ১৩৮টি পরক প্রজাতির খসড়া তালিকা করেছে। এর মধ্যে ১০৮টি উদ্ভিদ এবং বাকি ৩০টি প্রাণী প্রজাতি। এই তালিকায় আগ্রাসী হিসেবে ৩১টি উদ্ভিদ প্রজাতির নাম প্রাথমিকভাবে উল্লেখ করা হলেও তা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত বা যাচাই করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়ছে। এ ব্যাপারে আমি স্পিসিস সারভাইভাল কমিশনে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে তারা বাংলাদেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতির যাচাই করা সঠিক তালিকা প্রকাশ করতে পারছে না।

স্পিসিস সারভাইভাল কমিশন ২০০০ সালে পৃথিবীর সব থেকে খারাপ ১০০টি আগ্রাসী পরক প্রজাতির তালিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় সাতটি উদ্ভিদ (কচুরিপানা, উলু, নল, পুটুস, সুবাবুল, জারমানলতা ও আসামপাতা) ও পাঁচটি প্রাণী (আফ্রিকান দৈত্য শামুক, সালমো ট্রুটো, জাপানি রুই, তেলাপিয়া ও মশা মাছ) প্রজাতি। বাংলাদেশে এই প্রজাতিগুলোর আগ্রাসী কর্মকা-ের ওপর উন্নত মানের নির্ভরযোগ্য গবেষণা খুবই কম হয়েছে। কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধে বাংলাদেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতির তালিকা প্রকাশিত হলেও তালিকাভুক্ত প্রজাতিগুলোকে আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক মানদ- সব কটিতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে এসব প্রবন্ধে তালিকাভুক্ত প্রজাতিগুলোর আগ্রাসী চরিত্র নিয়ে বিভ্রান্তি আছে।

এ ছাড়া এসব তালিকার বাইরে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক জীব প্রজাতি রয়েছে, যাদের আমরা চিনি না এবং জানি না। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশে সন্ধিপদযুক্ত বিপুলসংখ্যক প্রাণী প্রজাতি রয়েছে, যাদের বেশির ভাগ আমাদের অজানা। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তাদের সন্তোষজনক কোনো তালিকাই করা হয়নি। পৃথিবীর সব থেকে খারাপ ১০০টি আগ্রাসী পরক প্রজাতির মধ্যে ১৪টি হচ্ছে পতঙ্গ প্রজাতি অর্থাৎ সন্ধিপদযুক্ত প্রাণী। সেই হিসাবে বাংলাদেশেও কিছু আগ্রাসী পরক পতঙ্গ প্রজাতি থাকা স্বাভাবিক। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতির বৈচিত্র্য, প্রকৃতি, প্রাচুর্য, ক্ষতির ধরন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অতি সীমিত।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশি ক্ষতিকর উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির অনুপ্রবেশ, তাদের চিহ্নিতকরণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য এখনই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে গভীর ও ব্যাপক গবেষণা শুরু করা প্রয়োজন। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ বিষয়ে পৃথক একটি সেল করা যেতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশে আগ্রাসী পরক প্রজাতির ওপর গবেষণার জন্য পৃথক সেল রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিষয়টি জরুরি। অতীতে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিবেদনে আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও এ সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো গবেষণা দেশে হয়নি। এ গবেষণা দ্রুত শুরু করা গেলে দেশের জীববৈচিত্র্য তথা বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষার জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। সেই সঙ্গে নতুন কোনো বিদেশি উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী দেশে আনার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। নতুন বিদেশি কোনো উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী প্রজাতি প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার আগে তার ওপর কয়েক বছর নিবিড়ভাবে গবেষণার দ্বারা বাস্তুতন্ত্রে তার সম্ভাব্য অভিঘাত জানা এবং সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *