অর্থনীতি লিড নিউজ

ব্যয়বহুল এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছে সরকার

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ব্যয়বহুল এলএনজিভিত্তিক (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী সরকার। সেই প্রেক্ষিতে দেশী-বিদেশী কোম্পানি এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রস্তাব দিচ্ছে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত অন্তত ১৮টি প্রকল্প প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে। যার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৪ হাজার ৮৬০ মেগাওয়াট। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দেশের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারের বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০১৬ অনুযায়ী ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে কয়লা থেকেই সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। তারপরই বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এলএনজিতে। তবে ওই দুটি জ্বালানিই আমদানিনির্ভর। তবে কয়লার দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকর। আর এলএনজি অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন হলেও এর দাম বেশি। এমন অবস্থায় ওই দুই জ্বালানি স্বল্পমাত্রায় ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের টেকসই উপায় গ্রহণ করতে পরামর্শ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন। একইসাথে দেশের সমুত্র ও স্থলে গ্যাসের বড় মজুদ থাকার যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজির দাম যেমন চড়া তেমনি আমদানিনির্ভর ওই গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারও ঘনঘন উঠানামা করে। তাই ওই জ্বালানির উপর বেশি নির্ভর করা উচিত হবে না। তাতে একদিকে যেমন বিদ্যুতের উত্পাদন ও গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়াবে, অন্যদিকে আমদানিতে সংকট দেখা দিলে বড় বিপর্যয় ঘটবে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির উদ্যোগ সম্পন্ন করেছে। তার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট পেট্রোবাংলা এবং ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করবে বেসরকারি কোম্পানি সামিট। ওই গ্যাস দেশীয় গ্যাসের সাথে মিশিয়ে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আর চলতি বছরই ওই গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হবে। ইতিমধ্যে ১৮টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ১৮টি প্রস্তাব জমা পড়েছে। তবে তার মধ্যে কয়েকটি প্রস্তাব অসম্পূর্ণ। ১১টি প্রস্তাব সক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করছে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি। যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলোর অনুমোদন দেয়া হবে। ২০২৪ সাল নাগাদ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার বাইরে সরকার ইতিমধ্যে এলএনজিচালিত দুটি কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে সামিট পাওয়ার এবং ৭৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স।

সূত্র আরো জানায়, এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশী-বিদেশী প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রস্তাবটি দিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স। জার্মানভিত্তিক কোম্পানিটি নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে আর মূল চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। সব মিলিয়ে দেশে সিমেন্সের মোট ৮ হাজার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব রয়েছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেক্ট্রিক (জিই) মোট ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়েকটি কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের আহমেদ দালমুক আল মাকতুম এক হাজার মেগাওয়াট, জাপানের মিতসুই অ্যান্ড কোং ৬০০ মেগাওয়াট, ভারতের রিলায়েন্স এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, চীনের সিপিপিইসি (চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি) ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, চাইনিজ ন্যাশনাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট, ইন্দোনেশিয়ার পার্টামিনা এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এবং সিঙ্গাপুরের সেম্বকর্প এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। তাছাড়া দেশীয় প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ ৫০০ মেগাওয়াট, বেক্সিমকো ৪৬০ মেগাওয়াট, মিডল্যান্ড পাওয়ার ও শাহজিবাজার কনসোর্টিয়াম ৬০০ মেগাওয়াট, ইউনিক গ্রুপ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট, গোলার পাওয়ার এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি ব্যবহার করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যবহার দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা একদিকে এই জ্বালানি আমদানিনির্ভর। পাশাপাশি তা ব্যয়বহুলও। সময়মত এর প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি পাওয়া গেলেও উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও কয়েকগুণ বাড়বে। যা দেশের অর্থনীতি কিংবা জনগণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস জানান, জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যেই এলএনজিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হবে। কিন্তু দেশে গ্যাসের এতো মজুদ নেই। তাই বিকল্প জ্বালানি হচ্ছে এলএনজি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *