লিড নিউজ সারা বাংলা

বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হলেও ফি বাড়ানোর উদ্যোগ!

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: আশানুরূপ নয় দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার মান। কারণ বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। এমনকি আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া আসন সংখ্যার অনুপাতে নির্দিষ্ট শয্যার হাসপাতালের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেরই সেদিকে মনোযোগ নেই। কোনো কোনো মেডিকেল কলেজে হাসপাতাল থাকলেও রোগী থাকছে না। অথচ বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ রেখেই শিক্ষার্থীদের ফি বাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ফি প্রায় ৩ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিগত ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে শিক্ষার্থীপ্রতি ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো এতোদিন পর্যন্ত ওই হারেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করেছে। কিন্তু ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ওই ফি বাড়িয়ে ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফি বাড়িয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ওসব ফির মধ্যে ভর্তি ফি ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। তার বাইরে ইন্টার্নি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ও টিউশন ফি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার মান না বাড়িয়ে ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক মনে করছেন। তাদের মতে, অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষা উপকরণ, ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। ওসব সংকট দূর না করে ফি বৃদ্ধি মেডিকেল শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সেই সঙ্গে ব্যাহত হবে ভালো মানের চিকিৎসক তৈরিও।

সূত্র জানায়, ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় ৫৫টি আসন বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। যদিও বর্তমানে দেশে অতিরিক্ত চিকিৎসক রয়েছে। ২০১৬ সালে ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন চিকিৎসকের চাহিদার বিপরীতে জোগান ছিল ৭৪ হাজার ৯২৪ জনের। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ওই বছরে উদ্বৃত্ত চিকিৎসক ছিলেন ১১ হাজার ৫২৯ জন। ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জনের চাহিদার বিপরীতে দেশে চিকিৎসকের জোগান দাঁড়াবে ৭৪ হাজার ৯২৪ জন। ওই হিসাবে ২০২১ সালেই চাহিদার অতিরিক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ হাজার ৪০২। তার পাঁচ বছর পর উদ্বৃত্ত চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়ে হবে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৬৫। ৭১ হাজার ৩৭০ জনের চাহিদার বিপরীতে ২০২৬ সালে দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৫।

ইতিমধ্যে যেসব মেডিকেল কলেজের আসন বাড়ানো হয়েছে, সেগুলোর একটি ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটিতে ৫১টির সঙ্গে আরো ৫টি বাড়িয়ে আসন সংখ্যা ৫৬টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের আসন ১২০টির স্থলে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২৫টি। তাছাড়া মগবাজারের সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের আসন ৯৫টি থেকে বাড়িয়ে ১০০, শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে ১৩০টির স্থলে ১৪০, শাহবাগে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজে ১১০টির স্থলে ১১৫, মগবাজারের হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজে ১৩৫টির স্থলে ১৪০, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে ১৩০টির স্থলে ১৩৫ ও সিলেটের পার্কভিউ মেডিকেল কলেজে ৫০টির স্থলে ৬০টি করা হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি বেশকিছু মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ পরিদর্শনে গতবছর একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান না বাড়িয়ে ফি বাড়ানোকে অনৈতিক বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, এটা করা হয়েছে নিছক ব্যবসায়িক স্বার্থে। তাতে সার্টিফিকেট বিক্রি ছাড়া ভালো চিকিৎসক তৈরি হবে না। আর দেশে সার্টিফিকেটসর্বস্ব চিকিৎসকের দরকার নেই। তাছাড়া বসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় শিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের শীর্ষপর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ ১৮ মার্চ এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতেও মেডিকেল কলেজ হচ্ছে। সেখানে শিক্ষার মানটা যথাযথ আছে কিনা সেদিকে নজর দেয়া দরকার। কারিকুলামগুলো ঠিকমতো আছে কিনা সেদিকেও বিশেষভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে ফি বাড়ানো যৌক্তিক বলে দাবি করছেন বেসরকারি মেডিকেল কলেজের উদ্যোক্তারা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক ইকরাম হোসেন বিজু জানান, শুধু ভর্তি ফি বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য ফি একই আছে। একজন শিক্ষার্থী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতি মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা টিউশন ফি গুনতে হচ্ছে। সে তুলনায় মেডিকেল কলেজে অনেক কম নেয়া হচ্ছে।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ফি বৃদ্ধির বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানান, গত কয়েক বছর বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি ও অন্যান্য ফি বাড়ানো হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষকদের বেতন বেড়েছে। ওই কারণে ফি বাড়ানো হয়েছে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *