অর্থনীতি

নোট ছেঁড়া হলেই অচল হয়না

রিয়াজুল হক
নোটে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে। যেমন, আগুনে পোড়া নোট, দুই বা ততোধিক ভাগে বিভক্ত নোট, অস্পষ্ট সিরিয়ালের নোট, পোকায় কাঁটা নোট, ময়লা নোট, জোড়া লাগানো নোট, রং লাগানো নোট ইত্যাদি। আমার এক প্রতিবেশী বাজার থেকে দুই কেজি মাংস কেনার পর বিক্রেতাকে পাঁচশত টাকার দুইটা নোট দিলেন। বিক্রেতা একটি নোট রেখে অন্যটি ফেরত দিয়ে দিলেন। টাকার এক কোনায় সামান্য একটু ছেঁড়া আছে, সেজন্য সেই টাকা পাল্টে দিতে বললেন। তখন সেই প্রতিবেশী মানুষটি পড়লেন মহাবিপদে। পকেটে সেই মুহূর্তে আর তেমন টাকা ছিল না, যা মাংস বিক্রেতাকে দিতে পারেন। দোকানিকে যতই তিনি বোঝাবার চেষ্টা করলেন, এই ছেঁড়ায় কোন সমস্যা হবে না কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল। দোকানির সাফ কথা, স্যার এই টাকা কেউ নেবে না। ব্যাংকের ডিপিএস জমা দিতে পারব না। আপনি পাল্টে না দিলে আমার পুরাই ক্ষতি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে তিনি দুই কেজির পরিবর্তে এক কেজি মাংস নিয়ে বাড়ি আসলেন। এরপর বিকেলে যখন তার সাথে দেখা হল, আমাকে সেই পাঁচশত টাকা দিয়ে বললেন এটা কি করা যায়? খুব সামান্য একটু ছেঁড়া ছিল। শতকরা দুই ভাগ হবে সম্ভবত। অমি বললাম এই টাকায় সমস্যা নেই, চলবে। যে কোন ব্যাংকের শাখায় নিয়ে গেলে পাল্টে দেবে। তখন তিনি উপরের খুলে বললেন।

আমাদের প্রত্যেকের ছেঁড়া নোট সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কতটুকু ছেঁড়া থাকলে সেই নোট লেনদেনে আদৌ কোন সমস্যা হয়না, সেটা জানতে যে কোন ব্যাংকের শাখায় গেলেই হয়। যদি নিজের কাছে রাখলে মনে হয় সেই নোটের কোন বিনিময় মূল্য পাওয়া যাবে না, তবে নিকটবর্তী ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা পরিবর্তন করে নিতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক (নোট রিফান্ড) রেগুলেসন্স এ্যাক্ট-২০১২ এর আলোকে ছেঁড়াফাটা নোট ব্যাংক শাখায় গ্রহণ এবং উহার বিনিময় মূল্য প্রদান প্রসংগে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪-০১-২০১৩ তারিখ একটি পরিপত্র জারী করে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা মূলত দুইটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে অল্প ছেঁড়া ফাটা ও ময়লা নোটের বিপরীতে সম্পূর্ণ বিনিময় মূল্য প্রদান করে থাকবেন। (ক) উপস্থাপিত নোটটিতে সম্পূর্ণ নোটের ৯০% এর বেশি অংশ বিদ্যমান থাকবে এবং আসল নোট হিসেবে সনাক্ত হতে হবে। (খ) উপস্থাপিত নোট একাধিক খন্ডে খন্ডিত নয় এবং খন্ড দুইটি একই নোটের অংশ হতে হবে। খন্ডিত নোটের ক্ষেত্রে নোটের এক দিকে হালকা সরু কাগজ দিয়ে এমনভাবে জোড়া লাগাতে হবে, যেন আসল নোট সহজেই বোঝা যায়। দুই খন্ডে বিচ্ছিন্ন হয়নি, কিন্তু সামান্য নাড়াচাড়ায় নোটটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এমন জীর্ণ নোটের ক্ষেত্রেও এক পিঠে হালকা সরু কাগজ লাগাতে হবে, যেন নোটটি পরীক্ষা করতে কোন অসুবিধা না হয়।

যদি নোটের অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে থাকে, অর্থাৎ অত্যধিক জীর্ণ, আগুনে পোড়া, ড্যাম্প বা সম্পূর্ণ নোটের ৯০ ভাগ বা তার চেয়ে কম থাকলে, নোট গ্রহণের সাথে সাথে তার মূল্য প্রদান করা হয়না। এক্ষেত্রে, নোটের মূল্যমান, সিরিজ নম্বর, জমাদানকারীর নাম ও পূর্ণ ঠিকানা সম্বলিত আবেদন পত্রের সঙ্গে ব্যাংক নোটটি গ্রহণ করবে। জমাদানকারীর আবেদনপত্র সহ গৃহীত নোট শাখার ফরওয়াডিং পত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত পরিপত্রের বিধি মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় নোটটি প্রেরণ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নোটটি পাবার আট সপ্তাহের মধ্যে নোট রিফান্ড রেগুলেশন্স এর আওতায় নোটটির মূল্য প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে এবং মূল্য প্রদানযোগ্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে প্রদান করবে।

নোটে কোন সমস্যা মনে হলে অবশ্যই নিকটস্থ যে কোন ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করা প্রয়োজন। প্রতিটি ব্যাংক গ্রাহকদের সেবা দেবে। সকল শ্রেণীর মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতার আনার কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের জন্য ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই আমানতের বিপরীতে তাদের শস্য ঋণ দেয়া হচ্ছে। স্কুল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খুলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং এই ধরনের আমানত হিসাবের বিপরীতে সার্ভিস চার্জ নেই। হিজড়া সম্পদায়ের জন্যও ব্যাংক হিসাব খোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সকলেই যেন ব্যাংকের সেবা পেতে পারে, সেজন্যই সকল আয়োজন। এ কারণে ব্যাংক যে সকল সেবা প্রদান করে, সে সম্পর্কে সকলকে অবহিত হতে হবে। অনেকেই অজ্ঞতাবশতঃ সামান্য ছেঁড়া ফাটা বা ময়লা নোট চলবে কিনা, এই সন্দেহে কষ্টে উপার্জিত টাকা বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী দালালের নিকট কম মূল্যে বিক্রি করে দেয়। অথচ বিভিন্ন দুষ্ট চক্র থেকে পরিত্রান পেতে একটু কষ্ট করে ব্যাংকে গেলে, বিনিময়মূল্য হিসেবে পুরো টাকা বা যথাযথ পরিমাণ টাকা ফেরত পেতে পারতো।

সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজ ও বোধগম্য করা করার জন্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, ব্যাংকের প্রত্যেক শাখায় জনসাধারনের সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে “ছেঁড়া ফাটা ও ময়লা নোট গ্রহণ করা হয়”, এই মর্মে নোটিশ স্থাপন করতে হবে। নোটিশে উল্লেখ থাকবে, ময়লা অবিকৃত নোটের বিনিময়মূল্য জমা দানের সাথেই প্রদান করা হয়। কোন ছেঁড়া নোটের কোন অংশ যদি অনুপস্থিত থাকে এবং বিদ্যমান অংশ যদি ৯০% এর অধিক হয়, তবে সেরূপ নোটের সম্পূর্ণ বিনিময়মূল্য সরাসরি কাউন্টারের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। কোন নোট যদি একাধিক খন্ডে খন্ডিত না হয় এবং নোটের সম্পূর্ণ অংশ বিদ্যমান থাকে তাহলে সে নোটের সম্পূর্ন বিনিময়মূল্য কাউন্টারেই প্রদান করা হয়। একই সাথে, জাল নোট উপস্থাপনকারীকে এবং একাধিক নোটের বিভিন্ন অংশ সংযোজন করে (বিল্ট আপ) নোট উপস্থাপনকারীকে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট সোপর্দ করা হয়, বিষয়টি নোটিশে উল্লেখ থাকবে।

ছেঁড়া ফাটা নোট সম্পর্কে সামান্য ধারণা না থাকার কারণে, অনেকের ভোগান্তির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তার টাকা বাজারে চলবে কিনা এই দুশ্চিন্তায়। এই সুযোগে বিভিন্ন দালাল শ্রেণী বাট্টায় টাকা বিনিময়ের ব্যবসা করে থাকে। অথচ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা ইউনিয়নে কোন না কোন ব্যাংকের শাখা আছে। সব শাখাতেই ছেঁড়া নোট সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় এবং নোট গ্রহণ করা হয়। এখন প্রয়োজন আমাদের নিজেদের সচেতনতার। কোন কারণে যদি আমরা আমাদের অজ্ঞতার কারণে ছেঁড়া নোট বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়ে ক্ষতির সম্মখীন হই, তবে সে দায়ভার আমাদের উপরই এসে পড়ে। নোট ব্যবহারে আমাদের সকলের যত্নবান হওয়া উচিত।

 লেখকঃ উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, riazul.haque02@gmail.com

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *