অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন

শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই সুদের হার কমতে পারে

আবু আহমেদ
হঠাৎ কেন যেন বাংলাদেশ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাটা উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল। অর্থনীতিতে তারল্য সংকটের সৃষ্টি হলো, ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিযোগিতা করে ডিপোজিটরস রেইটকে (Depositors rates) বাড়িয়ে দিল। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হারও বাড়িয়েও দিল, যে সুদের হার এক ডিজিটে নেমে এসেছিল, সেই ল্যান্ডিং রেইট ডাবল ডিজিটে গিয়ে উঠল। শেয়ারবাজারটা ধসে গেল। অব্যাহত মূল্যপতনে একপর্যায়ে শেয়ারের মূল্যসূচক ৫৭০০-এর নিচে চলে গেল। বিনিয়োগ চাহিদারও কোনো বৃদ্ধি লক্ষ করা গেল না, বরং বিনিয়োগের অবস্থায় আগের স্থবিরতাটা যেন আরো গভীরতার রূপ নিল। রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু গতিটা পড়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে গেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চলতি হিসাবে ঘাটতিটা আরো বড় হয়েছে। সব কিছু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে মনে হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাটা ভালো যাচ্ছে না। এতদিন যতটাই ভালো গেছে, সেটাতে যেন ফাটল ধরেছে।
আমরা সবাই বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সুদের হার কমানোর কথা এতদিন বলে আসছিলাম, এখনো বলি।

সুদের হার হলো বিনিয়োগ চাহিদার অন্যতম নিয়ামক। অনেক দেশের অর্থনীতিতে সুদের হার যখন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তখনো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদের হার এক অঙ্কের ওপরে ছিল। অন্য দেশের অর্থনীতিতে সস্তায় অর্থ পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্থপ্রাপ্তিটা সব সময় ব্যয়বহুল ছিল। একপর্যায়ে এমনও বলা হলো, বাজার-সুদ কমাতে হলে সরকার কর্তৃক ছাড়কৃত সঞ্চয়পত্রগুলোর (Saving Certificates) সুদের হার কমাতে হবে। সরকার সেই যুক্তি গ্রহণও করল। গত বাজেট প্রস্তাবে ১ থেকে ২ শতাংশ করে সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমানো হলো। এতে কাজও হয়েছে। গেল অর্থবছরে আমাদের অর্থনীতিতে সুদের হার অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। আমরা আশা করছিলাম সুদের হারটা আরো কমবে; কিন্তু আমাদের সেই আশার গুড়ে বালি। সুদের হার তো আর কমল না, উল্টো বাড়তে শুরু করল। সুদের হার তো আর কিছুই নয়, অর্থের জন্য হাওলাতমূল্য (Price of borrowing)

ব্যাংক হাওলাত করে জনগণ বা প্রতিষ্ঠান থেকে। সেখানে ব্যাংক একটা মূল্য দেয়। সেই মূল্যের নাম হলো ডিপোজিটরস রেইট (Depositors rate) আর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হাওলাত করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। সেই হাওলাত বা ঋণ করার মূল্যকে বলা হয় লেন্ডিং রেইট (Lending rate)। এই দুই হারের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সেটাকে অর্থনীতিতে বলে সুদের spread

বাংলাদেশের আর্থিক বাজারে ইন্টারেস্ট স্প্রেড (Interest spread) অনেক বেশি, ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ, যে হার অন্য দেশে ২ থেকে ৩ শতাংশ বা আরো নিচে। অনেকে মনে করে, বাংলাদেশে ইন্টারেস্ট স্প্রেড বেশি হওয়ার মূলেও বিরাট অঙ্কের খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের যেন পাহাড় জমে গেছে। প্রায় এক লাখ কোটিতে পৌঁছে গেছে। খেলাপি ঋণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। ঋণখেলাপির দিক দিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো চ্যাম্পিয়ন। তারা নিজেদের ক্যাপিটালগুলো এরইমধ্যে খেলাপিদের কাছে হারিয়েছে। প্রতিবছর সরকারকে বলছে তুমি যেহেতু মালিক, তাই নতুন করে আমাদের ক্যাপিটাল দাও; নইলে যে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হতে চলেছে। সরকারও কী বুঝে জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও হাজার হাজার কোটি টাকার ফ্রেশ মূলধন দিয়ে এই ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখছে। গত ১০ বছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের শুধু অধোবদনই হয়েছে। একেকবার সরকার যখন বলে অমুক সরকারি ব্যাংককে মূলধন বাবদ আবার এত হাজার কোটি টাকা দিতে হবে, তখন ভাবি অর্থনীতিতে অন্যত্র অর্থপ্রাপ্তি কঠিন হলেও এই এক জায়গা, যেখানে অর্থপ্রাপ্তি অনেক সহজ! ব্যাংক পরিচালনা করতে গিয়ে অতি উদারভাবে ঋণ দিয়ে ব্যাংককে বসিয়ে দিয়েছে; কিন্তু যারা ঋণ দিতে ছিল উদার তারা আবার ঋণ আদায়ে যেন সমভাবে অক্ষম ছিল! এটা কেমন ব্যবসা! অর্থ দাও, সরকার তুমি যে মালিক, আর ব্যবসা করব আমরা, কোনো প্রশ্ন করতে পারবা না। ব্যবসায়ে লাভ-লোকসান আছে। ধরে নিলাম আমরা শুধু লোকসানই করলাম! এই কেমন এক আজগুবি ব্যবসা। সরকার জনগণ থেকে করের মাধ্যমে অর্থ এনে সরকারি ব্যাংকগুলোকে দিচ্ছে আর বছর ফিরতেই সেই অর্থ হজম! ফুটো বন্ধ না করে জল ঢাললে এমনই হয়। এখন জনগণ বুঝে নিয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোর তলাটার ফুটো বন্ধ হওয়ার নয়। এগুলো হলো জনগণের অর্থ সাবাড় করার মেশিন। জনগণ এখন তাদের কপালের দোষ দেয়।

বর্তমানে আর্থিক বাজারে তারল্য ঘাটতির যে অবস্থাটা সৃষ্টি হয়েছে, সেটা এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকই সজ্ঞানে এই অবস্থাটা সৃষ্টি করেছে। অবস্থাটা শুরু হয়েছে ডিসেম্বর থেকে। এটা গভীর হয়েছে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। বলা চলে, নতুন মুদ্রানীতি এই অবস্থাকে আরো অ্যাকিউট করে তুলেছে। তারল্য সংকট কোনো ব্যাংক বা আর্থিক বাজার নিজে সৃষ্টি করেনি। যখন থেকে হুকুম এলো অউজ (Advance-deposit ratio) কমাও তখন থেকেই শুরু হলো অর্থের সংকট। স্বাভাবিকভাবেই যেসব ব্যাংকের অউজ ওপরে ছিল, তারা তাদের সহজে বিক্রিযোগ্য সম্পদ বিক্রি করে সেই হারকে ঠিক রাখতে চেষ্টা করল। একপর্যায়ে দেখা গেল ব্যাংকগুলো তাদের পোর্টফোলিওতে (Portfolio) থাকা প্রায় সব শেয়ারই বেচে দিল। হঠাৎ শেয়ারবাজারের লোকেরা টের পেল শেয়ারের সরবরাহ যেন বেড়ে গেছে। প্রথমে তারা ধরে নিয়েছিল চাহিদা কমার কারণে মূল্যসূচক পড়ছে। পরে তারা ঠিকই বুঝল শেয়ারের সরবরাহটাই বেড়ে গেছে এবং সেটা ঘটেছে ব্যাংকগুলো তাদের হিসাবে রক্ষিত শেয়ারগুলো বেচে দেওয়ার কারণেই।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের মুদ্রা সরবরাহ কমাতে লাগল। তারা ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোমরের বেল্ট আরো শক্ত করে বাঁধতে বলল। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করেছে, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ এরইমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। ১৬.৫ শতাংশের স্থলে ১৮.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এতে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হতে পারে। এতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান আরো পড়ে যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা আবার সুদে অর্থ পেয়ে আমদানি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বাণিজ্য খাতে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সের আরো ঘাটতি হতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক হুকুম দিল অর্থপ্রাপ্তিকে কঠিন করো। ঋণ দেওয়া কমাও। ব্যাংকে আগের তুলনায় বেশি তারল্য ধারণ করো। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও অর্থপ্রবাহে লাগাম টেনে ধরতে যা করা দরকার সবই করেছে। অর্থ সরবরাহের গ্রহণযোগ্য পরিমাপক হলো ব্যাপক অর্থে মুদ্রা গ২। গ২ -কে বাড়ানো-কমানো যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ছাড়কৃত রিজার্ভ অর্থের পরিবর্তন করে। গ২ বা মুদ্রা সরবরাহ কত হবে, তা নির্ভর করে কী পরিমাণ রিজার্ভ মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিতে ছাড়ল তার ওপর। এর সঙ্গে অন্য ভ্যারিয়েবল হিসাবে নেয়া হলে পাওয়া যায় Money multiplier-এর ভ্যালু বা মান। মানি মাল্টিপ্লায়ারের মান যদি সঠিক থাকে, তাহলে মুদ্রা সরবরাহ কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা রিজার্ভ মুদ্রা ছাড়ল তার ওপর। মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো-কমানো হয় ওপেন মার্কেট অ্যাপারেটাসের মাধ্যমে; যে বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক একসঙ্গে মুদ্রা বেচাকেনা করতে গিয়ে Repos & Reverse Repos নামে দুুটি পলিসি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। গেল ঘোষিত মুদ্রানীতিতে গ২ বৃদ্ধির গতি কমানোর কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই চাচ্ছে অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ কমে আসুক। এ অবস্থায় সুদের হার তো বাড়বেই।

সম্প্রতি সুদের হারের যে ঊর্ধ্বগতি লক্ষিত হয়েছে, এটা এ জন্যই ঘটেনি যে বাজারে ঋণের জন্য চাহিদা বেড়ে গেছে। বরং এটা এ জন্যই ঘটেছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটা সংকোচনশীল মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে অউজ কমানোর জন্য বলা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গ২-এর বৃদ্ধিকে শ্লথ করার কথা বলা হয়েছে। তাহলে আমাদের অর্থনীতি পর্যাপ্ত বা প্রয়োজনীয় অর্থ পাবে কোথায়? যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। বর্তমানে যে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে, এটা অনেকাংশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-অবস্থানের কারণে। একপর্যায়ে এসে আর্থিক বাজার পুনঃস্থিতাবস্থায় পৌঁছে যাবে, তবে সেটা ঘটবে উচ্চ সুদের হারে। কিন্তু সে অবস্থাটা কি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে? অবশ্যই না। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান মুদ্রানীতি সাংঘর্ষিক। বলা চলে, বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে দেশ কম বিনিয়োগ পাবে। এবং অর্থনীতি তার পূর্ণ বিকাশমান অবস্থান থেকে দূরে থাকবে। তাই সুদের হার কমাতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবনায় মুদ্রানীতির যে সংকট আছে, এটা অনেকটা অমূলক। মুদ্রানীতি যে কারণে ঘটছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনশীল মুদ্রানীতি এটাকে ঠেকাতে পারবে না। বরং উল্টো এই মুদ্রানীতি আমাদের শিল্প খাতের পূর্ণক্ষমতার ব্যবহারকে ব্যাহত করবে। নতুন বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হলো, বর্তমানে Industrial Capacity অলস পড়ে রইল শুধু অর্থের অভাবে, সেই ধরনের নীতি কিভাবে অর্থনীতির পক্ষে যাবে বা ওই নীতি কিভাবে মূল্যস্ফীতি রুখবে? আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক তার ভুল বুঝতে পারবে এবং সুদের হার কমাতে সহায়তা করবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *