অর্থনীতি

চাল-গমের অস্বাভাবিক বেশি আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের আশঙ্কা

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: বন্যায় গতবছর হাওড়ের বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির কারণে চাল উৎপাদনে টান পড়ে। আর ব্লাস্টের কারণে গমেরও কাক্সিক্ষত উৎপাদন হয়নি। ফলে ওই দুই খাদ্যশস্যের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছর দেশে চাল ও গম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ টন। আর তার আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৭ হাজার টন। অর্থাৎ গত অর্থবছর প্রধান দুই খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমেছে সাড়ে ৯ লাখ টন। কিন্তু তার বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসেই চাল ও গমের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। যদিও উৎপাদন ঘাটতির মধ্যেই ওই সময় দেশে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতেও কিছুটা বাড়তি খাদ্যশস্যের প্রয়োজন। তবে আমদানি যে পরিমাণে বেড়েছে, বিশেষজ্ঞরা তাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, হয় উৎপাদনের তথ্যে গরমিল আছে, তা নাহলে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রোহিঙ্গা চাপ এবং দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণে খাদ্যশস্যের আমদানি কিছুটা বাড়ার কথা থাকলেও তা অস্বাভাবিক হারেবেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে দেশে চাল ও গম আমদানি হয়েছে ৬৮ লাখ ৪০ হাজার টন। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য দুটির আমদানি ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টন। অর্থাৎ সাড়ে ৯ লাখ টন উৎপাদন ঘাটতির বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩২ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদন ঘাটতির সঙ্গে বাড়তি মানুষের প্রয়োজন যোগ করলে যে চাহিদা দাঁড়ায়, ৭ মাসে তার চেয়ে বেশিই চাল-গম আমদানি হয়েছে। আর প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি আমদানি হওয়ায় দেশে চালের বাজারে দাম কমার কথা। কিন্তু গত কয়েক মাসে তারও কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে চাল আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছর চালের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণে জোর দেয়া হয়। চাল আমদানিতে আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি শূন্য মার্জিনে ব্যবসায়ীদের চাল আমদানিরও সুযোগ দেয়া হয়। ফলে পণ্যটির আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে শুধু চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্যটি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮৮ কোটি টাকা। আর গম আমদানিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে খাদ্যশস্যটি আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার। খাদ্যশস্য আমদানির এমন পরিসংখ্যানে ব্যাংকারদের মধ্যেও সন্দেহ জেগেছে।
সূত্র আরো জানায়, গত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। তারপরও চালের বাজারে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। যে পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে, সে পরিমাণ চাহিদা না থাকলে ওই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর দেশে চাল-গমের আমদানির তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে দেশে খাদ্যশস্যের বাড়তি মজুদ তৈরি হবে। ফলে সামনের বোরো মৌসুমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে খাদ্যশস্য আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের মতো ঘটনা ঘটছে কিনা প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল মাসুদ জানান, চাল আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হলে তার দাম আন্তর্জাতিক তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে দেখা হয়। তাছাড়া পণ্য না দিয়ে জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে, এমন শঙ্কার কথা বিবেচনায় নিয়ে চার্টার্ড ভেসেল পরিহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাহাজগুলো পরীক্ষা করা হয়। ফলে মেশিনারি আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার যে গুঞ্জন আছে, খাদ্যশস্য আমদানিতে তা বিন্দুমাত্রও নেই।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *