শিল্প সাহিত্য

কানামাছি ভোঁ ভোঁ

আনোয়ারা আজাদ
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে আমাকে জানানো হয়, ওখানে এখন সামার চলছে। সে কারণে পাতলা একটা শাল ছাড়া আমি আর কোনো গরম কাপড় সঙ্গে নিয়ে যাইনি। কিন্তু মেলবর্নের আবহাওয়া যে এতটা ক্ষ্যাপাটে সেটা টের পেলাম এয়ারপোর্টের বাইরে বের হয়েই। কনকনে ঠা-া বাতাসের ঝাপটা কানের পাশে দিল একটা ঝাড়ি! ও বাবা, এ কী অবস্থা! ভাগ্যিস এয়ারপোর্টে ভাতিজি বুদ্ধি করে একটা সোয়েটার নিয়ে হাজির হয়েছিল, না হলে ঝাড়ি খেতে খেতে বাড়ি যেতে হতো।
মাসটা ডিসেম্বর। ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত্ম সামার চলবে। তারপরেই শুরম্ন হবে শীত। কনকনে, হিমহিম।
মেলবর্নের আবহাওয়াটা আসলেই একটু অদ্ভুত। একটু মুডি বলা যায়। সিডনির আবহাওয়া আবার অন্যরকম, সেখানে প্রচুর বাঙালি বাস করে। ভাতিজি গাড়িতে চড়েই আমার বেল্ট বেঁধে দিতে দিতে বলল- এখানে বেল্ট বাঁধা ছাড়া গাড়িতে চড়লে ফাইন দিতে হয়। জানালো সে।

শাঁই শাঁই করে গাড়ি চালায় ভাতিজি জামাই। গন্ত্মব্যস্থল ‘টারনিট’। পুরো মেলবর্নে কয়েকটি সাবার্ব বা শহরতলী, তারমধ্যে ‘টারনিট’ একটি। কোনো জ্যাম নেই তারপরেও যদি বা দুয়েকটা গাড়ি একটু লাইনচ্যুত হচ্ছে তাতেই বিরক্তি প্রকাশ। উহ্, কী অবস্থা! রাস্ত্মা দেখে আমি তখন এতটাই বিমোহিত যে মনে মনে হাসারও অবসর পাই না (ঢাকার রাস্ত্মার কথা চিন্ত্মা করে)। আহা, কী সুন্দর রাস্ত্মা এখানে। এই ওপরে উঠছে গাড়ি এই নিচে নামছে। অনেক দূর পর্যন্ত্ম দেখা যাচ্ছে গাড়িগুলোর আকার ছোট হয়ে খেলনা গাড়ির মতো গড়িয়ে যাচ্ছে, আবার বিরাট ঢাউস কোনো একটা গাড়ি শাঁই করে পাশ দিয়ে কোনো হর্ন না বাজিয়েই চলে যাচ্ছে। আর আকাশ! ঝকঝকে বিশাল নীল আকাশ বুকের মধ্যে তুলো তুলো মেঘ নিয়ে শুয়ে-বসে আছে নানা রকম চেহারায়। কোথাও মনে হচ্ছে গাছ তো কোথাও মাছ! কোথাও দেখে মনে হচ্ছে প্রার্থনারত কেউ। মেঘের এরকম শিল্প আগে কখনো চোখে পড়েনি। প্রায় এক ঘণ্টায় ঘর-বাড়িও চোখে পড়েনি তেমন। এত বিশাল অনন্ত্ম আকাশ দেখতে পাওয়ার সুযোগ আমাদের ঢাকাবাসীর কপালে নেই। আমাদের আকাশের ওপর পর্যন্ত্ম রাজ্যের সব ঘরবাড়ি!
বিকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পুরো বাড়িতে এসি চলছে! সেকি কথা! এসি কেন?
জানা গেল পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি চলছে।

শোয়ার সময় কুইল্ট গায়ে দিয়ে ঘুমালাম, সম্ভবত বিশ ডিগ্রির মতো ছিল। ঢাউস সোয়েটার গায়ে জড়াতে জড়াতে একটু বোকা বোকা গলায় বললাম। বুঝলাম ক্লান্ত্ম শরীরে শুয়ে যাওয়ার পরপরই মেলবর্নের টেম্পারেচার বিশ থেকে এক লাফে পঁয়ত্রিশ ডিগ্রিতে উঠে গেলে এসি চালাতে হয়েছে।
বাব্বা, এ আবার কোন তামাশা! একেবারে রাস্ত্মাগুলোর মতো ওঠানামা! এখানে যারা বসবাস করে তাদের মনের অবস্থাও কী ঠিক এ রকমভাবে ওঠানামা করে? হতেও পারে!
বেশ কিছুদিন ঘোরাঘুরি করার পর মেলবর্নের আবহাওয়ার মুড বুঝতে পারি। এখানে প্রতিদিনের আলোচনার প্রধান একটা বিষয় যে আবহাওয়া সেটা আরও বেশি ভালো বুঝতে পারি। আমাদের দেশের রাজনীতির মতো কী? অনেকটা। নিজেকেই শোনাই।

সকালে মিষ্টি মধুর হাওয়া তো বিকালে কড়কড়া রোদ্দুর, মাঝেমধ্যে ঝুম করে বৃষ্টিও শুরম্ন হয়ে যাচ্ছে। যদিও সবারই স্মার্ট ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগাম জানিয়ে দিচ্ছে, কাল মেঘলা থাকবে নাকি কড়া রোদ থাকবে নাকি হালকা বৃষ্টি। তারপরও তো একটা ব্যাপার আছে না! ঠিক কোন সময়টাতে হাওয়া বদলাবে, মাথায় থাকে? তবে যারা পারমানেন্ট থাকে বা থাকছে, অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছে। আমাদের মতো যারা অন্য দেশে হাওয়া বদলের জন্য কিংবা রিফ্রেশ হওয়ার জন্য আসে তাদের সোয়েটার আর এসির চক্করে পড়ে নাস্ত্মানাবুদ অবস্থা। আমার গায়ে সারাক্ষণই একটা পাতলা সোয়েটার দেখে আমার ভাই মহা বিরক্ত। সে থাকে সানশাইন’-এ। বিশ-বাইশ ডিগ্রিতে আমার ঠা-া লাগলেও ওরা নাকি গরমে বাঁচে না! প্রথম প্রথম যে ওদেরও ওরকমটা হয়েছিল সেটা বলে না! কারও কারও দু’তিন বছর লেগে যায় আবহাওয়া অ্যাডজাস্ট হতে, জানায় অবশ্য। তবে সামারেই এই সমস্যাটা প্রকট অন্য সময় এতটা আনপ্রেডিক্টেবল থাকে না বলেই শুনেছি।
১৬ ডিসেম্বর ওখানকার বাঙালিরা (কিছু সংখ্যক) চমৎকার একটা অনুষ্ঠান করেছিল মূলত শিশুদের নিয়ে। তারা একটা স্কুল করেছে যেখানে সপ্তাহে একদিন শিশুদের বাংলা শেখায় নিজেদের গরজে এবং সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে। শুধু বাংলা কথা বলা বা লিখতে শেখানো নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও হাতেখড়ি দেয়া হয়ে থাকে। যা দেখে আমি খুবই আশান্বিত। যাক বাবা, বিদেশে জন্ম নেয়া শিশুগুলো বাংলা তো শিখছে। দেশে এসে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ইংরেজিতে সারাক্ষণ খটরমটর করে কথা না বলে চেষ্টা করে বাংলা বলতে তো পারবে। ঝরঝরা বাংলা না বলতে পারম্নক, বোঝা গেলেই হলো। যেমনটা বলছে ওই বাংলা স্কুলে যাওয়া শিশুগুলো। তুমি গেমো কচ্ছ? মানে সে বলতে চাইছে, আমি ঘেমে যাচ্ছি কিনা। তারপরও যাই বলছে, সেগুলো শুনেই শান্ত্মি, চেষ্টা তো চলছে। বাংলা শব্দ তো বলছে। একসঙ্গে গান শিখছে- ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে, বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে…। ওদের বাবা-মায়েরা বাড়িতে বাংলায় কথা বললে কী হবে, যে স্কুলগুলোতে শিশুরা পড়াশোনা করছে সেখানে তো সারাক্ষণই ইংরেজির চর্চা হচ্ছে। ক্লাসমেটরা বাঙালি হলেও সেখানে ইংরেজিটাই বলতে হচ্ছে। এটাই নিয়ম। তাছাড়া ওরা যে অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নিয়েছে এবং সে কারণে জন্মসূত্রে ওরা অস্ট্রেলিয়ান সে জ্ঞানও ওদের বেশ টনটনে দেখলাম। ফলে বাড়িতে এসেও তারা ইংরেজিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু যেহেতু সপ্তাহে একদিন ওই বাংলা স্কুলটাতে ওরা যাওয়া-আসা করছে তাতে নিজেদের মধ্যেও বাংলায় কথা বলতে পারাটাও একধরনের কমপিটিশনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেটা অবশ্যই পজিটিভ।

পৃথিবীর প্রতিটা দেশেই বাঙালি বাবা-মায়ের শিশুদের বাংলা শেখানোর স্কুল থাকাটা অত্যন্ত্ম জরম্নরি। তাহলে অন্ত্মত দেশে বেড়াতে এসে তাদের বলতে হবে না, জানেন না তো, আমার শিশুরা বাংলা বলতেই চায় না, পড়তেও চায় না। আসলে বাবা-মায়েরাই যে শিখতে দিতে আগ্রহী নয় এ কথা লুকোতে চায় শিশুর ওপর দোষ চাপিয়ে।
ভাবখানা যেন শিশুদের বাংলা শেখাটা একটু ঘেয়েমি। শুনেই হাত নিশপিশিয়ে উঠতো! এখন দেখি সেটা আর বলে না, এখন যে যত বেশি ভাষা জানবে সে তত বেশি স্মার্ট, আর সেটা যদি হয় নিজ দেশের ভাষা তাহলে তো কথাই নেই, বিষয়টা এখন বুঝতে পেরেছে তারা। দেশে দেশে একুশে ফেব্রম্নয়ারি পালন করে ফেসবুকে ছবি আপলোড করলেই তো আর সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না, তার জন্য নিজেদের ভাষা রপ্ত করতে না পারলে লোক দেখানো অনুষ্ঠান না করাই ভালো। বিদেশিরা এখন আমাদের দেশে এসে প্রথমেই বাংলা ভাষা শেখার জন্য চেষ্টা করছে। এমনকি বাংলা গানও গাইছে। সেখানে বাঙালি বাবা-মায়ের সন্ত্মানরা বাংলা ভাষা বলতে ও লিখতে পারবে না, এটা মেনে নেয়া যায় না। তো ১৬ ডিসেম্বরের সেই অনুষ্ঠানে মৃদুমন্দ বাতাসে আপস্নুত হয়ে সবুজ শাড়ি হাওয়ায় উড়িয়ে মাঠে বসে শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে ওদের বাবা-মায়েদেরও বালিশ চালাচালি দেখার ক্রিটিকাল একটা পর্যায়ে হুট করে বেশরম হাওয়া বাবাজি ঝটিকা সফরে বের হয়ে মাঠের মধ্যখানে! যারা বালিশ চালাচালিতে নিবিষ্ট ছিল তাদের কাবু করতে না পারলে কী হবে, আমরা যারা বাইরে থেকে তক্কে তক্কে ছিলাম কার হাতে বালিশ পড়ে তাদের কাবু করে ফেললো, অবশ্য সবাইকে না। যার যার আঁচল কিংবা ওড়না দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে কনকনে বাতাস সামাল দিতে হলো।
মেলবর্নের আবহাওয়া আসলেই অন্যরকম। কিশোরী মেয়ের মতোন কী! এই হাসিখুশি ছলছল এই মুখ ফুলিয়ে চোখ টলমল! নতুন যারা যাবে বিশ্ব রাজনীতির ভাও বুঝে উঠলেও মেলবর্নের বাতাস বুঝে উঠতে বছর দুই লেগেও যেতে পারে! ততদিন কানামাছি ভোঁ ভোঁ।

আনোয়ারা আজাদ: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *