শিল্প সাহিত্য

কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনা একটি শোকাবহ অধ্যায়

শফিকুল ইসলাম খোকন
স্বজন হারানোর বেদনা সকলের আছে, সকলেই স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করেন। নেপালের এ দুর্ঘটনায় আমরা গোটা জাঁতি মর্মহত। এমন মর্মান্ত্মিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না।
যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয় ‘স্বজন হারানোর বেদনা কত কষ্টের?’ উত্তর আসবে এর চেয়ে কষ্টের কিছুই নেই। পিতা-মাতার সামনে সন্ত্মানের মৃত্যু আর সন্ত্মানের সামনে পিতা-মাতার মৃত্যু- এর চেয়ে কষ্ট এ পৃথিবীতে আর নেই। বিমান দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, এটিও তেমনি কষ্টের; তারা কোনো না কোনো পরিবারের স্বজন। এখন পরিবারের স্বজন আর নেই, এখন আমাদের স্বজন, বাংলাদেশের স্বজন, মানবতার স্বজন, মানবিকতার স্বজন। তাদের জন্য এখন গোটা বাংলাদেশ কাঁদে, বাংলাদেশের মানুষ কাঁদে।

বাংলাদেশের বেসরকারি মালিকানাধীন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-২১১ একটি উড়োজাহাজ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত্ম হয়ে নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হয়। উড়োজাহাজটিতে ৭১ আরোহীর মধ্যে ৬৭ জন ছিল যাত্রী, বাকি চারজন ক্রু। পাইলট-ক্রুসহ আরোহীদের ৩৬ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালের এবং একজন করে যাত্রী ছিল চীন ও মালদ্বীপের। ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৯ জন কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৫ জন বেঁচে নেই।

নেপালের স্থানীয় সময় ১২ মার্চ সোমবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত্ম হয় ও আগুন ধরে যায়। দ্রম্নত ঘটনাস্থলে বিমানবন্দরের উদ্ধারকারী দল, নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যায়। দুর্ঘটনার পর ত্রিভুবন আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়। যান্ত্রিক ত্রম্নটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, রাডারের ভুল সিগন্যাল পেয়ে পাইলট উড়োজাহাজ অবতরণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ যার বিরম্নদ্ধেই হোক, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ এবং বিচারের আওতায় আনা জরম্নরি। কিন্তু এ মুহূর্তে আহতদের দ্রম্নত চিকিৎসা এবং নিহতদের স্বজনদের কাছে পৌঁছানো ও ক্ষতিপূরণ দেয়াটা তার চেয়ে বেশি জরম্নরি।

বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে। সেই দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণহানিও হয়েছে। আর বিমান দুর্ঘটনার সবচেয়ে পতিত হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি পরিচিত নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর। এর আগেও আরও বহু বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। পাহাড় ঘেরা এই বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। একের পর এক বিমান দুর্ঘটনার কারণে এই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়শই আলোচনা হয়। বিমানবন্দরটিতে প্রথমবারের মতো আন্ত্মর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত্ম ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত্ম হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিমান দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। যারা আন্ত্মর্জাতিক খবরের পাঠক তারা হরহামেশাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট-বড় বিমান দুর্ঘটনার খবর পড়েন বা দেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার খবর কমই বলা চলে। কালেভদ্রে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় অনেকে নিহত হলেও যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা হাতেগোনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৮৪ পর এটাই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা। যা ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট ১৯৮৪ ঢাকায় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে অবতরণ করার সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফকার এফ২৭-৬০০ জিয়া আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরের (শাহজালাল আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দর) কাছাকাছি একটি জলাভূমির মধ্যে বিধ্বস্ত্ম হয়। বিমানটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে জিয়া আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্বনির্ধারিত ঘরোয়া যাত্রী ফ্লাইট পরিচালনা করছিল।

বাংলাদেশের বিমান দুর্ঘটনা : বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও উইকিপিডিয়ার বরাতে জানা যায়, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যাত্রীবাহী বিমান যাত্রা শুরম্ন করে। এরপর ১৯৮৪ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফকার এফ২৭-৬০০ এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটায়। এতে নিহত হন বিমানে থাকা ৪৯ জন। এর মধ্যে বিমানের যাত্রী ছিলেন ৪৫, বাকিরা ওই বিমানের ক্রু। এরপর ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে আবারও দুর্ঘটনার শিকার হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান। এবারের ঘটনাস্থল সিলেট ওসমানী আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দর। জরম্নরি অবতরণের সময়ে ‘ফকার এফ২৮’ মডেলের বিমান কুয়াশার কারণে রানওয়ের পাশের ধানক্ষেতে পড়ে। এতে বিমানটি মাঝখান থেকে দু’ভাগ হয়ে গেলেও কেউ নিহত হননি। বিমানে থাকা ৮৫ যাত্রীর মধ্যে আহত হন ১৭ জন। এরপরে ২০০১ সালে আবারও সিলেট বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে একই বিমান পরিচালন সংস্থার একই মডেলের বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। তবে এবারও কেউ নিহত হননি। ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর আবারও সিলেট বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটে। এবারও আবার ‘ফকার এফ২৮-৪০০০’ মডেলের বিমান আলোচনায়। বিমানটি সেদিন প্রচ- বৃষ্টির মধ্যে নামতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে যায়। কিন্তু এতে বিমানের থাকা ৮৩ জনের মধ্যে ৮ যাত্রী আহত হন। ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি সিলেট ওসমানী আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসা ‘বিজি-৫২’ বিমানের ইঞ্জিনে ঢুকে পড়ে একটি পাখি। এতে বিমানটি জরম্নরি অবতরণে বাধ্য হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই বছরের ৯ মার্চ কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের সময় একটি কার্গো বিমান বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত্ম হয়। এতে বিমানের ৪ ক্রু প্রাণ হারান। সবশেষ ১২ মার্চ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমানটি বিধ্বস্ত্ম হলো। এতে ৫০ জনেরও বেশি আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন।

দেশের বাইরে বিমান দুর্ঘটনা : আন্ত্মর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, দেশের বাইরে ২০১৪ সালের ৮ মার্চ মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ২৩৯ জন যাত্রী নিয়ে কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার পথে হারিয়ে যায়। এখনো সেই বিমানের হদিস মেলেনি। এয়ার ফ্রান্স : বিমান হারানোর ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালের ১ জুনেও। সে সময় ব্রাজিল থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পথে আটলান্টিক মহাসাগরে হঠাৎ করে হারিয়ে যায় এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান। প্রায় দু বছর পর সাগরের নিচে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় এর খোঁজ পাওয়া যায়, এতে ২২৮ যাত্রীর সবাই নিহত হন। বিমান চালানোর অত্যাধুনিক ব্যবস্থা কাজ না করায় বিমানটি দ্রম্নতগতিতে নিচে নেমে অ্যাটলান্টিকের পানিতে তলিয়ে যায় বলে পরবর্তীতে তদন্ত্ম রিপোর্টে জানা গেছে। ভোজা এয়ার : ২০১২ সালের ২০ এপ্রিল পাকিস্ত্মানের বেসরকারি ‘ভোজা এয়ারে’র একটি বিমান ল্যান্ডিংয়ের সময় নামতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে ১২৭ যাত্রীর সবাই নিহত হন। বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে নামার চেষ্টাই দুর্ঘটনার কারণ বলে প্রাথমিক তদন্ত্মে জানা গেছে। বোয়িং ৭৩৭-২০০ বিমানটি করাচি থেকে ইসলামাবাদ যাচ্ছিল। ইরান এয়ার : ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি ইরান এয়ারের একটি বোয়িং ৭২৭-২০০ বিমান তেহরান থেকে অরম্নমিয়ে যাওয়ার পথে নামতে গিয়ে খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনায় পড়লে ১০৫ জন যাত্রীর মধ্যে ৭৭ জন নিহত হন। বেঁচে যায় ২৮ জন। এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস : দুবাই থেকে ভারতের ম্যাঙ্গালোর বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামার পর এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমান রানওয়ে থেকে ছিটকে দূরের পাহাড়ে গিয়ে আঘাত করলে বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। এতে ১৫৮ জন নিহত হন। আর বেঁচে যান আটজন। পাইলটের গাফিলতি দুর্ঘটনার কারণ বলে তদন্ত্মে জানা যায়। ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালের ২২ মে। আফ্রিকিয়া এয়ারওয়েজ : পাইলটের ভুলের কারণে ২০১০ সালের ১২ মে আফ্রিকিয়া এয়ারওয়েজের একটি বিমান লিবিয়ার ত্রিপোলিতে ল্যান্ডিংয়ের আগে দুর্ঘটনায় পড়লে ১০৩ জন যাত্রী নিহত হন। তবে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যায় হল্যান্ডের নয় বছরের এক ছেলে! প্রেসিডেন্টের মৃত্যু : ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল পোল্যান্ডের বিমানবাহিনীর একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে দেশটির সে সময়কার প্রেসিডেন্টসহ ৯৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। পোল্যান্ডের সরকারি তদন্ত্ম প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য পাইলটকে দায়ী করা হয় বলা হয়, খারাপ আবহাওয়ায় ল্যান্ডিং এর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছিল না পাইলটের। ইয়েমেনিয়া : ল্যান্ডিং-এর আগে ইয়েমেনের এয়ারলাইন্স ‘ইয়েমেনিয়া’-র একটি বিমান সাগরে ভেঙে পড়লে ১৫৩ জন যাত্রীর ১৫২ জনই মারা যান। শুধু বেঁচে যায় ১২ বছরের একটি মেয়ে দুর্ঘটনার কারণ পাইলটের ‘ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানুভার’।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে পরস্পর বিরোধ বক্তব্য যেমন শুরম্ন হয়েছে তেমনি নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরের দুর্ঘটনার সংখ্যা ইতোমধ্যে হিসাব কসা শুরম্ন হয়েছে। শুধু হিমালয়কন্যা নেপালে গত ৭ বছরেই ১৫টি ছোট-বড় পেস্নন ক্রাশের ঘটনা ঘটেছে। নেপালের জরিপ সংস্থা নেপাল ইন ডাটা অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত্ম এসব পেস্নন ক্রাশের ঘটনায় মোট ১৩৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। ওই ৭ বছরের প্রতি বছর কমপক্ষে একটি করে বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ পর্যন্ত্ম আন্ত্মর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এপর্যন্ত্ম ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে শুধু এখানেই। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও প্রাণহানি ঘটে। নেপালে দুর্ঘটনার পর ৬ সদস্যের তদন্ত্ম টিম গঠন করা হয়েছে। ‘বস্নাক বক্স’ সংগ্রহ করা হয়েছে। দেখা যাক তদন্ত্ম টিম কি বলছে আর বস্নাক বক্স কি জানান দিচ্ছে।
স্বজন হারানোর বেদনা সকলের আছে, সকলেই স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করেন। নেপালের এ দুর্ঘটনায় আমরা গোটা জাঁতি মর্মহত। এমন মর্মান্ত্মিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না।
শফিকুল ইসলাম খোকন: কলাম লেখক ও গবেষক

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *