সারা বাংলা

দেশজুড়ে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে হাজার হাজার অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

বিএনএন ৭১ ডটকম
ঢাকা: দেশজুড়ে কী পরিমাণ অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবসা চালাচ্ছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। বরং অভিযোগ রয়েছে- স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাই অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ ওসব সেন্টার চালু রাখার গোপন অনুমতি দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে সারাদেশে এমন সেন্টারের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর বারবার ঘোষণা দিয়েও দেশব্যাপী কার্যকর অভিযান অব্যাহত রাখতে পারছে না। বরং স্বাস্থ্য অধিদফতরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওই সব অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার লালন পালন করে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে বৈধ লাইসেন্সে মাত্র ৬ হাজার ৮৬৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে সেন্টারের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ওসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা সেবার নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। শুধু রাজধানীতেই লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা মাত্র ৪০৫টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৬৬০টি। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীতে রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। কাঁচামাল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মাছ ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক বনে গেছেন। তাদের কাছে আধুনিক চিকিৎসাসেবার কোন গুরুত্ব নেই, আছে শুধু লাভের ফন্দিফিকির। ওসব প্রতিষ্ঠানের সামনে সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দীর্ঘ তালিকাযুক্ত বিরাট মাপের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হলেও বাস্তবে তাদের কাউকেই পাওয়া যায় না। মূলত রোগী আকর্ষণের জন্যই শুধু বিশেষজ্ঞদের নাম সাইনবোর্ডে লেখা হয় এবং নাম ব্যবহার বাবদ মাসিক ফি দেয়া হয়। এমনকি বেশির ভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত সার্টিফিকেটধারী দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই।

সূত্র জানায়, বছরের পর বছর ধরেই দেশের বিপুলসংখ্যক অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সরকারি তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি অনুমোদনপ্রাপ্ত সেন্টারগুলোরই খবর নিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে অনেক সেন্টারই লাইসেন্স নবায়ন না করেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে দেশজুড়েই অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি। ওসব সেন্টারের অধিকাংশেরই নেই সরকাান অনুমোদন। কোথাও কোথাও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে সাজিয়ে বসেছে হাসপাতালের ব্যবসা। ভর্তি করা হয় রোগী। ভাড়া করে আনা হয় চিকিৎসক। এমন ফাঁদে পড়ে নানা হয়রানি শিকার হয়ে আসছে অনেক রোগী। সাইনবোর্ড সর্বস্ব ওসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মনীতির বালাই নেই, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দ্বারাই চালানো হয় রোগ নির্ণয়ের যাবতীয় পরীক্ষা। তারা মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে ঠকাচ্ছে নিরীহ মানুষকে। একই রোগ পরীক্ষায় একেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একেক রকম রিপোর্ট পাওয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে। এমনকি রোগী মারার কারখানা হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওসব সেন্টার থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েন। নানা সমালোচনার মধ্যেও সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণীর ডাক্তারদের সহায়তায় বছরের পর বছর ওসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্টবাণিজ্য চলছে। এমনকি বার বার অভিযোগ তুলেও তার কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে, কমিশনের লোভে দেশের বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালের প্যাথলজিক্যাল বিভাগটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দেয়া হয় না। সেখানে সবচেয়ে দামি দামি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে দ্রুততম সময়েই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে।

সূত্র আরো জানায়, বেসরকারি অধিকাংশ রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অনুমোদন নেয়ারও প্রয়োজনবোধ করছে না। বরং কেউ কেউ লাইসেন্সের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন পাঠিয়েই বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রোগ নিরাময় কেন্দ্র খুলে বসেছে। ভুঁইফোড় ওসব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্বশীল বিভাগটি বরাবরই চরম উদাসীন। এমনকি পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রও নেয়নি অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ফলে প্রতিনিয়ত রক্ত মিশ্রিত ব্যান্ডেজ, মাংসের টুকরা, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের আশপাশের খোলাস্থানেই। নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো ইনসিনেটরে পোড়ানোর কথা। কিন্তু ওসব বর্জ্য থেকে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ধুয়ে মুছে আবার ব্যবহার করারও অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ঘটছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে খোলা জায়গায় ফেলে রাখার কারণে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ডাক্তাররা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সরবরাহকৃত সিøপে টিক মার্ক দিয়ে দেন কোন কোন টেস্ট করাতে হবে। রোগী তার পছন্দমতো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ওই টেস্ট করালে ডাক্তার সে রিপোর্ট গ্রহণ করে না। ডাক্তার তার নির্ধারিত সেন্টার থেকে আবার একই টেস্ট করিয়ে আনতে চাপ দেন। ওই সেন্টার তাকে কমিশন দেয়। কমিশন নিশ্চিত হলে পরেই চিকিৎসা। পরীক্ষার ফি বাবদ ইচ্ছে মাফিক টাকা-পয়সা আদায় করা হচ্ছে। একই ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য একেক প্রিিতষ্ঠানে ধার্য আছে একেক ধরনের ফি।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারি একটি রেট চার্ট দেয়া আছে। ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮০ ও সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা, মাইক্রোবায়োলজি এ্যান্ড ইমিউনোলজিতে সর্বনিম্ন ১৫০ ও সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০ টাকা, বায়োকেমিস্ট্রিতে সর্বনিম্ন ১২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, হিস্ট্রোপ্যাথলজিতে সর্বনিম্ন ৫০০ ও সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা, ড্রাগ এবিউজে সব ধরনের পরীক্ষা সাড়ে ৫০০ টাকা, থেরাপিউটিক ড্রাগের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা ও ভাইরোলজির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০০ ও সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নির্ধারিত তালিকামূল্যের তুলনায় কয়েক বেশি ফি নিয়ে থাকে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান. সরকার দেশে নিরাপদ জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে রাজধানীসহ সারাদেশের অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা তৈরির পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগ এ অভিযান পরিচালনা করছে। তবে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জনসাধারণকেও সোচ্চার হতে হবে। ওসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *