বিশেষ প্রতিবেদন সারা বাংলা

নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে চাই মনঃসংযোগের সুরক্ষা

ড. মো. নাছিম আখতার
সম্প্রতি সংঘটিত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনটি ছিল চরিত্রগুণে অসাধারণ। মাত্র কয়েক দিন ছিল এর আয়ুষ্কাল। দাবি সামান্যই, চাই নিরাপদ সড়ক। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করা হয়। নতুন আইনে চালকের শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদ-। আর যদি প্রমাণিত হয় যে এটি ইচ্ছাকৃত হত্যা, তাহলে শাস্তি মৃত্যুদ- পর্যন্ত হতে পারে। নতুন আইন প্রণয়নের পর যে দুর্ঘটনা কমেছে, তা মোটেও বলা যাবে না। পত্রিকায় চোখ রাখলেই আমরা দেখি প্রতিদিন বহু মানুষ দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে। স্বজন হারানোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে আমাদের সামাজিক জীবন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়িও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পায়নি। তিনি কুমিল্লায় তাঁর এক বক্তব্যে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা ক্যান্সার ও কিডনি রোগের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিবছর মারা যাচ্ছে ছয় হাজারের বেশি মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনা কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না! তার কিছু গূঢ় কারণ ও প্রতিকার তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
গাছ থেকে ফল পড়া আমরা অনেকেই দেখেছি। কিন্তু সেই ফল পড়া দেখে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ব্যাখ্যা কিন্তু একজনই দিয়েছেন। তিনি হলেন বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। কোনো কিছু উদ্ভাবনে মেধা ও মনঃসংযোগের কোনো বিকল্প নেই। তা ছাড়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো বিষয়ে সফলতার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খুব বেশি দরকার, তা হলো মনঃসংযোগ। চালকের আসনে বসা ব্যক্তির এক সেকেন্ড মনঃসংযোগের ঘাটতি ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

মনঃসংযোগ ঘাটতির প্রথম কারণ মাদকাসক্তি। জন্মের সময় আমরা যে মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মাই তা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের নানা ঘটনা বা নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়। আধুনিক জীবনে কাজের চাপে মানুষের মধ্যে হতাশা, উৎকণ্ঠাসহ মানসিক লক্ষণগুলো সর্বাগ্রে পরিলক্ষিত হয়। জীবনের হতাশা, অন্যমনস্কতা, উৎকণ্ঠা ইত্যাদি লাঘবের জন্য দরকার নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন। কিন্তু বর্তমান সামাজিক পরিবেশে বিরাজমান বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা এবং নেশার উপকরণ মানুষের সুষ্ঠু মানসিকতার জীবন যাপনের সুযোগ একেবারেই সীমিত করে দিচ্ছে। এর প্রভাব পরিবহন খাতে আরো বেশি পরিলক্ষিত হয়। গত ২৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে বাংলাদেশ সড়ক শ্রমিক ফেডারেশনের মহাসচিব এনায়েতুল্লাহ্ বলেছেন, ঢাকা শহরে পরিবহন শ্রমিকের ৩৫ শতাংশ মাদকাসক্ত। এটা সত্যি উদ্বেগের বিষয়। মাদকাসক্ত মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুষ দিয়ে গাড়ি চালানো কতটা বিপজ্জনক তা সচেতন মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য। দেশে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু তার পরও মাদকের চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না। সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে লাখ লাখ ইয়াবাসহ মাদক কারবারিরা ধরা পড়ছে, জেলে যাচ্ছে, আবার আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে একই পেশায় যুক্ত হচ্ছে। আমার পরামর্শ, এই বিপুল জনসংখ্যার দেশকে যেকোনো ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষায় মাদকের সম্পূর্ণ রূপে নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। তা ছাড়া সরকার ও পরিবহন মালিকপক্ষ থেকে মাসে অন্তত একবার পরিবহন শ্রমিকদের দেহে মাদকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা দরকার। এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে পরিবহন খাতে মাদকমুক্ত জনবল পাওয়া সম্ভব। এ ধরনের কার্যক্রমে যেমন রক্ষা পাবে জনগণের অমূল্য জীবন, তেমনি নিরাপদ থাকবে কোটি কোটি টাকা মূল্যের যানবাহন।

আমার স্কুলজীবনের এক বন্ধু বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি। তাঁকে যখন বললাম যে আমি পরিবহন খাতের এই বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি। তখন তিনি আমাকে আরো একটি তথ্য দিলেন, যা কখনো আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। হাইওয়ের ধারে সাময়িক খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রামের জন্য বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট থাকে। সেই রেস্টুরেন্টে বাসের সুপারভাইজার ও ড্রাইভারদের বিনা পয়সায় খাওয়ানো হয়। কোনো কোনো রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ পরিবহন শ্রমিকদের অতিরিক্ত আপ্যায়নের জন্য বিনা পয়সায় মাদক সরবরাহ করে থাকে। এটা তারা করে ব্যাবসায়িক লাভের আশায় চালকদের আকৃষ্ট করতে, যাতে চালকরা সব সময় ওই রেস্টুরেন্টে গাড়ি থামায়। কথায় আছে, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। রেস্টুরেন্ট মালিকদের এতে হয়তো ব্যাবসায়িক লাভ হয়, কিন্তু বিপন্ন হয় যাত্রী ও পথচারীর জীবন। তাই এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ মনিটরিং দরকার বলে আমি মনে করি।

দুই বছর ধরে দুই হাজার ৬০০ স্কুলছাত্রের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে স্মার্টফোন বা ইলেকট্রনিকস ডিভাইসে যারা দীর্ঘ সময় কাটায়, তাদের মনোযোগের মারাত্মক ঘাটতি দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের মধ্যে মনোযোগ ঘাটতির সমস্যাটিকে অ্যাটেনশন ডেফিসিট অথবা হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিস-অর্ডার নামে অভিহিত করা হয়। সমীক্ষার প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আমেরিকার মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। স্মার্টফোনের কারণে মানুষের বিশ্রাম নেওয়ার সময়টাও বিশ্রাম নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবসর সময়ে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া বা কম্পিউটার গেম খেলে মাথা ক্লান্ত রাখে। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য এটা মারাত্মক ক্ষতির কারণ। স্বল্প শিক্ষার কারণে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই বললেই চলে। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলগুলো নিয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রচারণার ব্যবস্থা থাকা দরকার। মনঃসংযোগে ঘাটতির কারণে অফিসের কর্মকর্তার কর্মের উৎকর্ষ কমতে পারে, পাঠকের বই পড়া অভ্যাস নষ্ট হতে পারে, ছাত্রের মনঃসংযোগ নষ্ট হলে তার পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে পারে, একজন বিজ্ঞানীর মনঃসংযোগ নষ্ট হলে আবিষ্কার ব্যাহত হয়। কিন্তু একজন চালকের মনঃসংযোগ নষ্ট হলে তার নিজের জীবন এবং যাত্রীর জীবন মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ৬০ কিলোমিটার গতির কোনো যানবাহন এক সেকেন্ডে ৫১ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে। তাই চালকের এক সেকেন্ডের মনঃসংযোগ ঘাটতির পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আমাদের মতো জনবহুল দেশ, যেখানে রাস্তাকে কেন্দ্র করেই বাজার বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে, সেখানে অমনোযোগিতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটা মুহৃর্তের ব্যাপার মাত্র। তাই চালকদের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। তা ছাড়া পথচারী ও চালক উভয় পক্ষেরই ট্রাফিক আইনের প্রতি থাকতে হবে শ্রদ্ধাবোধ।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সড়ক দর্ঘটনা কমানো সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। তবে সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনের জন্য দরকার তিনটি পক্ষ, যথা পথচারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় সাধন। সব পক্ষকেই বুঝতে হবে এ দেশ আমাদের। দেশের সব ভালো-মন্দের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমাদের বর্তমান ও ভ্যবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। তাই সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই বাস্তবায়িত হতে হবে নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

Related Posts